
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে দুই দশকে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন। তথ্য বলছে এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ। এরআগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ অবস্থায় কী কারণে এইচএসসির ফলাফল খারাপ হয়েছে তা নিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে চলছে আলোচনা। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ শব্দ দিয়ে এইচএসসির ফলাফল মূল্যায়ন করা যাবে না।
আর শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আববার (সি আর আবরার) বলছেন, এবারের এইচএসসির ফলাফল অস্বস্তিকর। তবে একইসঙ্গে এটি বাস্তবভিত্তিক বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ব্রিফিং করেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল হক।
তিনি জানান, এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। ফেল করেছেন ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন শিক্ষার্থী।
তিনি আরও জানান, এবার ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৪.৬২, রাজশাহীতে ৫৯.৪০, কুমিল্লায় ৪৮.৮৬, যশোরে ৫০.২০, চট্টগ্রামে ৫২.৫৭, বরিশালে ৬২.৫৭, সিলেটে ৫১.৮৬, দিনাজপুরে ৫৭.৪৯, ময়মনসিংহে ৫১.৫৪, মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে ৭৫.৬১ এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ৬২.৬৭।
খন্দোকার এহসানুল হক জানান, এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন।
ফলাফলের তুলনামূলক চিত্র
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। তাদের তথ্যানুসারে, ২০০৫ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৫৯ শতাংশের বেশি। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৬৪ শতাংশের ওপরে, ২০০৮ সালে প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে তা কমে যায় ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশে। পরবর্তী বছরগুলোয় পাসের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। শুধু তিন বছর (২০১৫, ২০১৭ ও ২০১৮) ৭০ শতাংশের নিচে নেমেছিল।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সরাসরি পরীক্ষা হয়নি, ফলে ‘বিশেষ প্রক্রিয়ায়’ সবাই উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২১ ও ২০২২ সালে ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় পাসের হার ছিল এক বছর ৮৪ শতাংশের বেশি, আরেক বছর ৯৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু ২০২৩ সালে তা আবার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আর এ বছর পাসের মহার ৫৮ শতাংশের বেশি।
অন্যান্য সূচকেও এবারের এইচএসসির ফল পিছিয়ে থাকছে। এ বছর শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। গত বছর ১ হাজার ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে সব শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন, এ বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩৪৫–এ। আর শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২। গত বছর ৬৫টি প্রতিষ্ঠানে এমন ফল দেখা গিয়েছিল।
দুই দশকে কেন সর্বনিম্ন পাস
এইচএসসির ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে সচিবালয়ে কথা বলেন শিক্ষা উপদেষ্টার সি আর আবরার। তার মতে, ফল বিপর্যয়ের দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারবে না। এবারের এইচএসসির ফলাফল অস্বস্তিকর। তবে এবারের ফলাফলকে বাস্তবভিত্তিক বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, কেন এ ধরনের ফলাফল হয়েছে, তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ডাটাভিত্তিক পর্যালোচনা করা হবে।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যাই ছিল তৃপ্তির মানদণ্ড। তবে আমরা চাই শিক্ষার ফলাফল আবার বাস্তবতায় ফিরে আসুক। দেশে ফলাফলের এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে সংখ্যাই বড় সত্য হয়ে উঠেছিল।’
তিনি বলেন, ফলাফল ভালো দেখাতে গিয়ে শেখার সংকট আড়াল করার এই সংস্কৃতি আমরা বন্ধ করতে চাই। চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা আবার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করুক।
এদিকে এক ব্রিফিংয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই ক্যাটাগরিতেই এগিয়ে মেয়েরা। এবার শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে, বেড়েছে শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করেছে। ৩৪৫ প্রতিষ্ঠানে সবাই পাস করেছে।
এহসানুল কবির বলেন, ‘এবার আমরা স্বাভাবিক পরীক্ষার ধারায় ফিরেছি। পূর্ণ সিলেবাস, পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণ সময়ের ওপর পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এতে হয়তো শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নিতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেখুন, আমরা কিন্তু চাই না একজন পরীক্ষার্থীও ফেল করুক। তবে শিক্ষার মান যে তলানিতে নেমেছে; অতিরঞ্জিত যে ফলাফল বিগত বছরগুলোতে দেখানো হয়েছিল, তাতে ক্ষতি হয়ে গেছে। সেখান থেকে ফিরে আসতে তো হবে। এটা করতে গেলে কোথাও না কোথাও আপনাকে থামতেই হবে।’
এইচসিতে পাসের সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে যশোর শিক্ষাবোর্ড। ফল বিপর্যয়েল কারণ জানিয়ে এই বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক আব্দুল মতিন বলেন, জুলাই আন্দোলনে রাজপথে থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে কিছু ঘাটতি ছিল। তাছাড়া এবার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরীক্ষার্থীদের খাতার যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে। এসব কারণে পাসের হার কমেছে বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. তোহিদুল ইসলাম বলেন, ফলাফল বিপর্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। ইংরেজি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন বোর্ড চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, দেশের ৯টি সাধারণ ও কারিগরি এবং মাদ্রাসা বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সেই হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ১৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
ফলাফলে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এইচএসসি পরীক্ষায় এবার শিক্ষার্থীর তিন বিষয়ে বেশি ফেল করেছেন। এইচএসসি পরীক্ষায় এবার বেশি ফেল করেছেন হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে। এবার এই বিষয়ে ফেল করেছেন ৪১ দশমিক ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। ইংরেজিতে ফেল করেছেন ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী; আইসিটিতে ২৭ দশমিক ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
এ বিষয়ে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, ‘প্রশ্নের ধরণ এবং খাতা দেখার ধরণ পরিবর্তনের কারণে জিপিএ-৫ কম এসেছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হয়েছে।’
এদিকে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীন ৪৩টি কলেজ থেকে এবার কেউ পাস করেনি। এরমধ্যে একটি হলো বীরগঞ্জের কবিরাজ হাট কলেজ। এই কলেজ থেকে ১০ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। গত বছর ১৫ জন শিক্ষার্থী এইচএসসিতে অংশ নিয়ে ৯ জন পাস করেছিল।
দেশপক্ষ/ এমএইচ









