।। জাকিরুল ইসলাম ।।
বাংলাদেশ এক জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্রান্তিকালের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সেই আস্থা আজ গভীরভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। রাষ্ট্র যখন এভাবে আস্থা সংকটে ডুবে যায়, তখন নেতৃত্ব পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক পছন্দ নয়—এটি হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পর জনমনে ছিল স্থিতি ও পুনর্গঠনের প্রত্যাশা। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে দেখা গেছে—নীতি নির্ধারণে অস্থিরতা, প্রশাসনের দুর্বলতা, এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব।
বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি—সবই দেখাচ্ছে যে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ব্যর্থ।
নেতৃত্বের এই ব্যর্থতা শুধু দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করছে না এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ওপরও আঘাত হানছে। একজন সরকারপ্রধান যদি জনগণের আস্থা ফেরাতে না পারেন, তাহলে তার অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংসতা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটগুলোর একটি। বহু প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা—সবই প্রশাসনিক দুর্বলতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।
কিন্তু গুরুতর বিষয় হলো—এই সহিংসতার তদন্ত না করে জঙ্গীদের দায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা ও জঙ্গিদমন প্রশ্নে জনআস্থার ঘাটতি সরকারের জন্য একটি মৌলিক ব্যর্থতা। রাষ্ট্র যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন নেতৃত্বের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত যৌক্তিক।
গণতন্ত্রে নেতৃত্ব অচল হয়ে গেলে শান্তিপূর্ণ পদত্যাগই সমাধানের প্রথম ধাপ।
ড. ইউনুসের পদত্যাগ—
বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে পারে,
প্রশাসনে নতুন উদ্যম ও আস্থা তৈরি করতে পারে,
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন নীতি-দৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি করবে,
জঙ্গিবাদদমন ও সহিংসতার বিচারকে আরও নিরপেক্ষতা দেবে,
এবং সর্বোপরি জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।
আসলে বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়—রাষ্ট্রের সামগ্রিক সুস্থতা ও সংহতির প্রশ্ন। নেতৃত্ব পরিবর্তন কখনো ধ্বংস নয়; বরং এটি হতে পারে পুনর্গঠনের সুযোগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে—যে নেতৃত্ব জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তার টিকে থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। রাষ্ট্রের অগ্রগ্রতি নির্ভর করে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের ওপর।
আজকের সংকটে এই কাঠামো পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপই হলো বর্তমান নেতৃত্বের সরে দাঁড়ানো।
ড. ইউনুস যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে নতুন করে রাজনৈতিক আস্থা ফিরবে, বহুমতের অংশগ্রহণ বাড়বে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পথ তৈরি হবে। এটাই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা ও জবাবদিহিহীনতা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, প্রশাসনের সক্ষমতা, জঙ্গিবাদ দমন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থার পুনর্জন্ম—সবকিছুই এখন নির্ভর করছে একটি সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর।
ড. ইউনুসের পদত্যাগ তাই আজ রাজনৈতিক দাবি নয়—এটি রাষ্ট্রের স্থিতি, ভবিষ্যৎ এবং জনগণের অধিকারের স্বার্থে অপরিহার্য সিদ্ধান্ত।









