
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০১ সালকে ‘সহনশীলতার পরাজয়’ ও ‘প্রতিহিংসার রাজনীতির উত্থানের’ বছর হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ মদদে দেশে শুরু হয় দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার এক অন্ধকার অধ্যায়।
২০০১–এর পর রাজনৈতিক সহনশীলতার পতন
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও ২০০১ সালের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নতুন সরকারের শপথের পরপরই সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি—তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দমনে যে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়, তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন তারেক রহমান।
হাওয়া ভবন: ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র ও দুর্নীতির ঘাঁটি
চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর বনানীর ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে ওঠে কার্যত সরকারের বিকল্প শক্তিকেন্দ্র। কর্মকর্তাদের বদলি, বড় টেন্ডার, কমিশন বাণিজ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হতো এখান থেকেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্যারালাল গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে দেয় এবং ব্যাপক দুর্নীতির জন্ম দেয়। বিদ্যুৎ প্রকল্পে অনিয়ম, টেন পারসেন্ট কমিশন, বিদেশে টাকা পাচারসহ নানা অভিযোগ পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক তদন্তেও উঠে আসে।
২১ আগস্ট হামলা: প্রতিহিংসার রাজনীতির ভয়াবহ রূপ
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলাকে বিশ্লেষকেরা তারেক রহমানের ‘প্রতিহিংসার রাজনীতির চূড়ান্ত প্রকাশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বাঁচলেও আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আদালত তদন্তে হাওয়া ভবনে বসেই হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল বলে উল্লেখ করে এবং মামলায় তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।
জঙ্গিবাদের উত্থান
তারেক রহমানের প্রভাবাধীন সময়েই আহসানউল্লাহ মাস্টার ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ড ঘটে। একই সময়ে বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানদের মতো জঙ্গি নেতাদের উত্থানও ঘটে, যারা প্রকাশ্যে মহড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল প্রশাসনের রাজনৈতিক সুরক্ষার কারণেই। ১০ ট্রাক অস্ত্র আমদানি ও পাচারের ঘটনাও এ সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর প্রশ্ন তোলে।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিতর্কিতকরণ
নির্বাচনী সুবিধা আদায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে পছন্দসই ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান করার উদ্যোগ দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। দলীয় বিবেচনায় প্রশাসন ও বিচার বিভাগে নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার অভিযোগও ওঠে ঐ সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে।
বিশ্লেষকদের মতে, নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশে যে সীমিত কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা তারেক রহমানের আগ্রাসী রাজনীতির কারণে ভেঙে পড়ে। দমন–পীড়ন, দুর্নীতি, লুটপাট ও প্রতিপক্ষ নির্মূলের যে রাজনৈতিক মডেল তৎকালীন সময় গড়ে ওঠে, তা আজও দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সৃষ্টি করে আছে।
দেশপক্ষ/ এমএইচ