
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত অপরাধ ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। দেশের প্রায় সব বড় শহর ও বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানদার, পরিবহন মালিক, ট্রাক চালক ও শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার চাপে রয়েছেন। চাঁদা না দিলে হুমকি, হামলা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী আক্রমণের ঘটনাও ঘটছে।
এই চাঁদাবাজি কাঠামোর সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ আরও প্রকাশ্য ও বিস্তৃত হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশি সূত্র এবং একাধিক স্বতন্ত্র বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি এখন একটি শক্তিশালী অপরাধভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিনের চাঁদাবাজির বাস্তবতা
রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহরগুলোতে দোকানপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও দৈনিক, কোথাও সাপ্তাহিক, আবার কোথাও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহন খাতে ট্রাকপ্রতি, বাসপ্রতি এমনকি রিকশাপ্রতি নির্ধারিত হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক পরিবহন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“চাঁদা না দিলে রাস্তায় গাড়ি নামানো যায় না। কোথাও কোথাও পুলিশি তল্লাশির নামেও হয়রানি বেড়ে যায়।”
চাঁদা না দিলে হামলা ও প্রাণহানি
চাঁদাবাজি বিরোধী অবস্থান নেওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও দোকান ভাঙচুর, কোথাও বোমা হামলা, আবার কোথাও সরাসরি গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
গত ১৪ মাসে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত সহিংস ঘটনায় শতাধিক মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, চাঁদাবাজ চক্রগুলোর পেছনে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন,
“আমরা থানায় গেলে উল্টো আমাদেরই সাবধানে থাকতে বলা হয়। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।”
পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় স্বীকার করেন, কিছু এলাকায় “রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী” এই চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকায় অভিযান পরিচালনা জটিল হয়ে পড়ে।
অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের দুর্বলতা
বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এই অর্থের একটি অংশ স্থানীয় অপরাধী চক্রের হাতে যাচ্ছে, আরেকটি অংশ রাজনৈতিক কার্যক্রমে অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি—
• বাজার ব্যবস্থাকে বিকৃত করছে
• ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ধ্বংস করছে
• বিনিয়োগ পরিবেশে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করছে
• সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে
সরকারের অবস্থান ও জনমনে সংশয়
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি বিরোধী অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারও হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এসব অভিযান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক এবং প্রভাবশালী চক্রের মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, “যত দিন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাবে না, তত দিন চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না। এটি এখন পুরো ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে গেছে।”
ভুক্তভোগীদের আতঙ্ক ও নীরবতার সংস্কৃতি
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় শক্তি এখন ভয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। হামলা, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া এবং পরিবারকে হুমকির অভিযোগ নিয়মিতই শোনা যায়। এর ফলে সমাজে নীরবতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই নীরবতা ভাঙতে হলে রাষ্ট্রকেই আগে বিশ্বাসযোগ্য ভূমিকা নিতে হবে।
কী চাইছেন নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ীরা
নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি মূল দাবি তুলেছেন—
১. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন
২. ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও সাক্ষী সুরক্ষা
৩. চাঁদাবাজির অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে আর্থিক তদন্ত
৪. নিয়মিত ও স্বচ্ছ অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ
৫. দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের কঠোর প্রয়োগ
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য একটি কাঠামোগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নির্ভীক আইন প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের বাস্তব কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভয় ও নীরবতার এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্র – সবাইই দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়বে।
দেশপক্ষ/ এমএইচ









