ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৬:২৫ পূর্বাহ্ন

অন্ধকার থেকে আলোর পথে

৪,৬৮২ দিনের বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের মহিমা

বাঙালি জাতির সহস্র বছরের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি একটি অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, জাতির হৃদয়ে পূর্ণ তৃপ্তি আসেনি যতক্ষণ না তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এই মুক্তি ছিল কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি নয়, বরং একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পূর্ণতা।

single-ad-main-1

​কারাগার: তাঁর জীবনের দ্বিতীয় নিবাস ​বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর সংগ্রামের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। তাঁর জীবনের মোট ৫৪ বছরের (১৯২০-১৯৭৫) মধ্যে ৪,৬৮২ দিন তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। অর্থাৎ, জীবনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় তিনি জেলখানায় বন্দি ছিলেন।

​এই দীর্ঘ কারাবাসের একটি হিসাব তুলে ধরা হলো:

​ব্রিটিশ আমল: ১৯৩৯ সালে ছাত্রাবস্থায় প্রথমবার ৭ দিন জেল খাটেন। ​পাকিস্তান আমল (১৯৪৮-১৯৭১): ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়।

single-ad-main-2

​১৯৪৮-১৯৪৯ এর ভাষা আন্দোলনের সময় মোট ২০৫ দিন।
​১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় ২০৬ দিন।
​১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে ১,১৫৩ দিন।
​১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬-দফা দেওয়ার পর ১,০২১ দিন (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ)।
​১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ: ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে গ্রেপ্তারের পর পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে মোট ২৮৮ দিন।

​৮ জানুয়ারির সেই নাটকীয় মুক্তি

​১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেখানে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল, সেলে ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিবেক এবং তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

​১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ভোরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান থেকে একটি বিশেষ বিমানে করে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। সেদিন সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল একজন নেতার হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব।

লন্ডনে পা রাখার পর তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন: ​”আমি আজ এক চরম আনন্দের মুহূর্তে আপনাদের সাথে কথা বলছি। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যাচ্ছি, যারা আমাকে ভালোবাসে এবং যাদের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি।”

​বঙ্গবন্ধুর এই দীর্ঘ ৪,৬৮২ দিনের বন্দিত্ব ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য। তিনি চাইলে আপস করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন নির্জন কারাগার আর বাঙালির অধিকার। তাঁর এই নিঃস্বার্থ ত্যাগই বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ৮ জানুয়ারি তিনি মুক্তি না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ণতা হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হতো।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ