ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন

জুলাই আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থতা ঢাকতেই গণভোট: রেহমান সোবহান

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে প্রস্তাবিত গণভোট নিয়ে গভীর সন্দেহ ও কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, এই গণভোট রাষ্ট্র সংস্কারের প্রকৃত উদ্যোগ নয়; বরং জুলাই আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার একটি কৌশল।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে রেহমান সোবহান প্রশ্ন তোলেন—সরকার কি সত্যিই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে গণভোট আয়োজন করছে, নাকি উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তাঁর সহযোগীদের ‘খুশি করতেই’ এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

রেহমান সোবহান বলেন, দেশে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা সংস্কার নিয়ে একটা মিথ্যা বয়ানের মধ্যে পড়ে গেছি।” তিনি মনে করেন, এই বয়ান বাস্তব সংস্কারের পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যে ৩৮টি সংস্কার প্রস্তাবের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাধারণ নাগরিকদের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। অথচ এত জটিল ও বহুমাত্রিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রেহমান সোবহানের মতে, এটি একটি অস্পষ্ট ও গুরুত্বহীন প্রস্তাব, যা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১৮ মাসে সংস্কার বাস্তবায়ন অবাস্তব

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কার কোনো এককালীন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। তাঁর মতে, ১৮ মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, সংস্কার কার্যকর করতে হলে তা সংসদে আলোচনা, আইন প্রণয়ন এবং একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব। কেবল গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে—এমন ধারণা জনগণের সামনে তুলে ধরা বিভ্রান্তিকর।

সরকারি প্রচারণা নিয়েও প্রশ্ন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের সরাসরি প্রচার চালানোর সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, সরকারের বদলে এখন কিছু এনজিও কর্মী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং আলী রীয়াজের নেতৃত্বে একটি প্রচার কাঠামো মাঠে নেমেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রেহমান সোবহান বলেন, তাঁর সন্দেহ—অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যুক্ত উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় আসা তাঁর সহকর্মীদের আশ্বস্ত করতেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দেশ যেন আবার আগের রাজনৈতিক অবস্থায় ফিরে না যায়।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার একটি ‘কসমেটিক এরেঞ্জমেন্ট’ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি, যাতে জনগণ বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র সংস্কারের কিছু একটা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে আন্তরিকভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত কাগজে লেখা কোনো প্রস্তাবেরই বাস্তব মূল্য নেই।

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ব্যালটে চারটি বিষয়ের সারসংক্ষেপ থাকলেও ভোটাররা আলাদাভাবে মত দেওয়ার সুযোগ পাবেন না; তাদের কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুই বিকল্পের একটিতে ভোট দিতে হবে।

রেহমান সোবহানের মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার এই পদ্ধতি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সুসংবাদ নয়; বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের নামে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটকে আড়াল করার প্রয়াস।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন