ঢাকা, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২:৩২ পূর্বাহ্ন

পটপরিবর্তনের পর সরব আওয়ামী লীগ

# সরব হচ্ছে তৃণমূল, সারাদেশে খুলছে আওয়ামী লীগের রুদ্ধ দুয়ার
# দেশজুড়ে ৭০টির বেশি অফিস চালু, ঘটেছে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও

single-ad-main-1

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত হয়ে ‘সরকার’ গঠন করেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তৃণমূলে সরব হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা আওয়ামী লীগ অফিসে প্রবেশ করে দলটির নেতাকর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছে। যদিও তাদের এ কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে এ নিয়ে রাজনীতিক অঙ্গনে নতুন করে বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এরআগে ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভূত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর সারাদেশজুড়ে আওয়ামী লীগে কার্যালয়গুলো আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেয়া হয়। একইসঙ্গে পলাতক দলটির কেন্দ্রীয় অফিসসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়েও দখল করে এনসিপির দলীয় কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ট্য আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ ১৮ মাস পর সারাদেশে খুলছে আওয়ামী লীগের রুদ্ধ দুয়ার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও তৃণমূলে সরব হচ্ছে আওয়ামী লীগ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ দলটির পতন হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সাথে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও হতাহতের ঘটনার মামলার আসামি করা হয়। ফলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে এসব মামলায় গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। আবার অনেক নেতাকর্মী পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি দলটি ক্ষমতায় এলে ফের সরব হয়ে উঠে আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মীরা।

single-ad-main-2

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি রাজনৈতিক দলের নানা কর্মসূচি পালন করা দলটির নেতাকর্মীদের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে আওয়ামী লীগ দলটি কোন ধরনের কর্মসূচি পালন করতে পারছেনা। উল্টো তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছেনা নানা মামলা ও মামলার কারণে। ফলে বিএনপি দলটি জয় লাভ করার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সরবতা এটাই প্রমাণ করে যে বিএনপি দলটি একটি গণতান্ত্রিক দল। তারা এও বলছেন, দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা করছেন। তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং সাংগঠনিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুনর্গঠন করার আগে মাঠ পর্যায়কে সচল রাখা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই জরুরি। যদিও এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। তবুও স্থানীয় পর্যায়ে অফিস খোলার এই প্রবণতা আগামীতে দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,গত আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দৃশ্যপটে কোণঠাসা হয়ে পড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান পুনরায় সুসংহত করতে মাঠে নেমেছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলটির ৭০টিরও বেশি কার্যালয় পুনরায় খুলেছেন নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সদরের কার্যালয়গুলো গত দুই দিনে সক্রিয় হয়েছে। বন্ধ থাকা অফিসগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে স্থানীয় কর্মীরা সেখানে সমবেত হচ্ছেন। গত কয়েক মাস তালাবদ্ধ থাকার পর কার্যালয়গুলোর সামনে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি পুনরায় দেখা যাচ্ছে। তবে কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা সমবেত হয়ে জানান দিলে বিকালে কার্যালয়ে আগুন দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রায় দেড় বছর পর ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ অফিসের কার্যালয়ের সামনে প্রায় ১০-১২ জন নেতাকর্মী জড়ো হন। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে সেখানে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তবে এর কয়েক ঘন্টা পরই পুনরায় কার্যালয়টিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরআগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল এলাকায় অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। পরদিন ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থাকায় দীর্ঘদিন কোনো দলীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো জেলা কার্যালয়ে পুনরায় কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

একইদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর স্টেশন রোডে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এসে একদল নেতাকর্মী স্লোগান দিতে দিতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যালয়টি খুলে দেন এবং সেখানে দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারা স্লোগান দেয়। তবে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করে উদ্বোধনের ঘটনায় পৌর কমিটির সভাপতিসহ ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ১৮ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীতে জেলা কার্যালয়ের তালা ভেঙে ব্যানার টানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এসময় স্লোগান দিয়ে কার্যালয় দখলের ঘোষণা দেন তারা। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে ফেসবুকে ওই কর্মসূচির বেশ কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, অফিস দখলে দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা স্থানীয় কিছু আবেগি নেতাকর্মীর উদ্যোগ। একইদিন ভোরে কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের নেতা বাঁধন ও লুব্ধ’র নেতৃত্বে ছয় থেকে সাত জনের একটি দল জেলা শহরের ঘোষপাড়ার পরিত্যক্ত কার্যালয়ে ব্যানার টাঙিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে স্লোগান দেন। এসময় জয়বাংলা স্লোগান দেন তারা। তারা চলে যাওয়ার পর পতাকা উত্তোলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুপুর ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক সভাপতি আব্দুল আজিজ নাহিদের নেতৃত্বে একদল যুবক এসে কার্যালয়টি ভাঙচুর করে এবং ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওইদিন সকালে বরগুনা শহরের শেরেবাংলা সড়কে অবস্থিত আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টানানোর ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল ৭টার দিকে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ফাহাদ হাসান তানিম এবং জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নাইমের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রবেশ করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। একই সঙ্গে কার্যালয়ের ভেতরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টানানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, স্বল্প সময়ের মধ্যেই নেতাকর্মীরা কর্মসূচি সম্পন্ন করে সেখান থেকে চলে যান। ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বরগুনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহীন জানান, রাষ্ট্র ঘোষিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা একটি দলের বিভিন্ন অফিসে ছবি ও পতাকা উত্তোলনের ঘটনা উদ্বেগজনক। বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমের নিন্দা জানান তিনি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে উদ্বোধনী ব্যানার ও পতাকা উত্তলন করা হয়। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়েছে।

এ ছাড়া দলীয় কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়’ লেখা একটি ব্যানার ও জাতীয় পতাকা উত্তলন করা হয়। ব্যানারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ সোহেল রানার ছবি বসানো রয়েছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে মাস্ক পরা কয়েকজন তরুণকে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি হাতে দেখা যায়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় নগরের লোয়ার যশোর রোডের শঙ্খ মার্কেট এলাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রবেশ করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবিতে ফুলের মালা দেন নেতাকর্মীরা।

এ সময় তাঁরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিতে ফুলের মালা দেন এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার পর সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতাদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। পাশাপাশি কাঠের দরজা ও কাগজপত্রে আগুন জ্বালিয়ে দেন তাঁরা।

একইভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা কার্যালয় খুলেছেন দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। পরে তারা কার্যালয়ের সামনে জাতীয় সংগীত গেয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এভাবে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরব হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ দলটির নেতাকর্মীরা।

তবে রাজধানী ঘেঁষা জেলা নারায়ণগঞ্জে একেবারে ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যায়। এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছিটেফোটাও দেখা যায়নি। নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নং রেল গেইট সংলগ্ন আওয়ামী লীগের আফিসটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষর প্রবেশ করার জো নেই।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন