ঢাকা, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তির সংগ্রাম: নেতৃত্বের স্থপতি বঙ্গবন্ধু

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বাঙালির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা। আর সেই অস্তিত্বের প্রথম সোপান ছিল মাতৃভাষা বাংলা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক অনিবার্য শক্তি।

​১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ‘তমুদ্দুন মজলিস’ গঠিত হওয়ার পর ভাষার দাবিতে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, শেখ মুজিব ছিলেন তার অন্যতম অগ্রপথিক। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে এক সভায় তাঁরই প্রস্তাবে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে তিনি গ্রেফতার হন। রাজপথের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে শেখ মুজিবের কারাবরণ ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রথম সোপান।

single-ad-main-1

​১৯৫২ সালের সেই উত্তাল ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু কারারুদ্ধ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর চেতনা ছিল রাজপথে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি গোপনে ছাত্রনেতাদের সাথে বৈঠক করতেন। ১৯৫২-র সেই ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের রূপরেখা কারাগার থেকেই তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।

​আমরণ অনশন: ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি এবং মহিউদ্দিন আহমদ রাজবন্দিদের মুক্তি ও রাষ্ট্রভাষার দাবিতে অনশন শুরু করেন। জেলের ভেতরে তাঁর এই আপসহীন অবস্থান বাইরে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মনে দাবানলের মতো সাহস জুগিয়েছিল।

​বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলার সীমানায় বাংলাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে চীনে অনুষ্ঠিত ‘পিস কনফারেন্স অব দি এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজনস’-এ তিনি বাংলায় ভাষণ দেন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে বাংলা ভাষার প্রথম আনুষ্ঠানিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করেছিল যে, বাঙালি জাতি তার ভাষার প্রশ্নে কতটা আপসহীন।

single-ad-main-2

​৪. সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা থেকে রাজনৈতিক মুক্তি

​বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, ভাষার মুক্তি ছাড়া ভৌগোলিক মুক্তি সম্ভব নয়। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের রীতিকে তিনি একটি গণআন্দোলনে রূপ দেন। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন তাঁর এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।

​৫. একুশ থেকে একাত্তর: এক অবিচ্ছেদ্য যাত্রা

​বায়ান্নর সেই ভাষা আন্দোলনই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে জাতি তার ভাষার জন্য বুক পেতে গুলি নিতে পারে, সে জাতি তার স্বাধীনতার জন্যও প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। ভাষা আন্দোলনের সেই অবিনাশী চেতনাকেই তিনি ধারণ করেছিলেন ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে।

​”আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান। একবার মরে, বারবার মরে না।” — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ভাষা আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধু একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের অতন্দ্র প্রহরী। আজ যখন আমরা গর্বভরে বাংলা বলি, তখন প্রতিটি বর্ণের আড়ালে মিশে থাকে বঙ্গবন্ধুর সেই অসীম ত্যাগ আর দূরদর্শী নেতৃত্বের ইতিহাস।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন