ঢাকা, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩:১১ পূর্বাহ্ন

একুশের বিশ্বজয়

শেখ হাসিনার কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও একটি ঐতিহাসিক অর্জন

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এক রক্তাক্ত ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তবে এই গৌরবকে কেবল জাতীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও আদর্শের যোগ্য উত্তরসুরী শেখ হাসিনার। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ছিল বাংলাদেশের কূটনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। এই অর্জনের পেছনে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বিশ্বনেতৃত্বকে প্রভাবিত করার অসাধারণ দক্ষতা।

​একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার মূল ভাবনাটি এসেছিল কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের হাত ধরে। তারা ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামক সংগঠনের মাধ্যমে জাতিসংঘকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু জাতিসংঘের প্রটোকল অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রস্তাব গ্রহণের সুযোগ ছিল না। প্রস্তাবটি আসতে হতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

single-ad-main-1

​সময় ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসে, তখন ইউনেস্কোর সাধারণ সভার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা উপেক্ষা করে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রস্তাবটি পেশ করেন।

​প্রস্তাব পাঠানোর পরই শুরু হয় আসল চ্যালেঞ্জ। ইউনেস্কোর সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায় করা ছিল একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সরকারপ্রধানদের চিঠি পাঠান এবং ফোনে কথা বলেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতদের তিনি নির্দেশ দেন যেন প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিকে এই দিবসের গুরুত্ব বোঝানো হয়।

​বাংলাদেশের কূটনীতির মূল যুক্তি ছিল—এই দিবসটি কেবল বাংলা ভাষার জন্য নয়, বরং বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ৬ হাজারেরও বেশি মাতৃভাষাকে রক্ষার একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। এই যুক্তিটি বিশ্বনেতাদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

​১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে নিবিড় যোগাযোগের ফলে ভারত, পাকিস্তানসহ ২৮টি দেশ বাংলাদেশের এই প্রস্তাবকে সরাসরি সমর্থন (Co-sponsor) জানায়। অধিবেশনে কোনো বিরোধিতা ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গৃহীত হয়।

​এই স্বীকৃতির মাধ্যমে শেখ হাসিনা কেবল একটি দিনকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেননি, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি ‘সাংস্কৃতিক শক্তি’ (Cultural Power) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই স্বপ্নের প্রতিফলন, যিনি ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তারই উত্তরসূরি হিসেবে শেখ হাসিনা ভাষার লড়াইকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

​আজ বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে যখন নিজ নিজ মাতৃভাষায় গান গেয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়, তখন অবধারিতভাবেই বাংলাদেশের নাম উচ্চকিত হয়। শেখ হাসিনার সেই সময়কার কূটনৈতিক সাহসিকতা এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ না থাকলে আজ হয়তো একুশের চেতনা কেবল আমাদের ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। এই অর্জন আমাদের জাতিসত্তার অহংকারকে চিরস্থায়ী করেছে।

single-ad-main-2

​( মানিক লাল ঘোষ :- সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ