
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত একটি অবিনাশী নাম। আজ ২৯ মার্চ; বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম দাপ্তরিক কণ্ঠস্বরের অপহরণ দিবস। ১৯৪৮ সালে করাচির গণপরিষদে দাঁড়িয়ে যিনি প্রথম বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি তুলেছিলেন, ১৯৭১-এর এই কালরাতেই সেই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে উদ্যত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। কুমিল্লার কালিয়াজুড়ির বাসভবন থেকে ৮৪ বছরের এই অশীতিপর বৃদ্ধ এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপ কুমার দত্তকে অপহরণের পর তাঁরা আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র যখন তুঙ্গে, তখন ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি জানান, ”পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী। তাই গণপরিষদের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তি অনিবার্য।”
তাঁর এই একটি সাহসী প্রস্তাবই ছিল বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম দাপ্তরিক লড়াই। যদিও সেদিন শাসকগোষ্ঠী তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিন্তু তা পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতার হৃদয়ে যে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি করেছিল, তারই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারিতে। মূলত ধীরেন্দ্র নাথ দত্তই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সেই প্রথম সিপাহসালার, যিনি দাপ্তরিকভাবে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন স্বাধীনতার চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়, ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত তখন জীবনের সায়াহ্নে। প্রবল দেশপ্রেমের টানে নিরাপদ আশ্রয়ে না গিয়ে তিনি নিজ শহর কুমিল্লাতেই অবস্থান করছিলেন। অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তার এই মানুষটি আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, যা পাকিস্তানি জান্তারা কখনোই মেনে নিতে পারেনি।
২৯ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি মিলিটারির লোরি এসে থামে তাঁর বাড়ির সামনে। হানাদাররা জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় তাঁকে ও তাঁর পুত্রকে।
ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার পর এই বৃদ্ধ নেতার ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। শোনা যায়, তাঁর চোখের ওপর চালানো হয়েছিল পৈশাচিক আঘাত।
ধারণা করা হয়, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিজের রক্ত দিয়ে তিনি লিখে গেছেন বাঙালির মুক্তির শেষ মহাকাব্য।
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত কেবল একজন রাজনীতিবিদে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার মূর্ত প্রতীক। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও প্রাদেশিক পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালেও তিনি সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। আজকের এই দিনে এই মহান নেতার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত মানে বাঙালির মাথা নত না করার অমর কবিতা। তাঁর সেই প্রতিবাদী চেতনা যেন আমাদের বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি পদক্ষেপে চিরন্তন প্রেরণা হয়ে থাকে।
( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ