
টানা কয়েক বছর সন্তোষজনক অগ্রগতির পর দেশে হামের টিকাদান কভারেজে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (মিজেলস-রুবেলা/হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৮০ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৬০ শতাংশের নিচে।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, গত আট বছর অতি সংক্রামক এ রোগটির টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এমআর-১ টিকার কভারেজ ছিল ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এমআর-২ ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৬ দশমিক ৪ ও ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৮৮ দশমিক ১ ও ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮১ দশমিক ৭ ও ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ কভারেজ ছিল। ২০২১ সালে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭ দশমিক ৩ ও ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২২ সালে এমআর-১ শতভাগ এবং এমআর-২ ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৩ ও ২৪ সালেও এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল।
তবে ২০২৫ সালে এসে চিত্র পাল্টে যায়। ওই বছর এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ টিকার কভারেজ ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পতনের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ‘অ্যাক্টিভ ক্যাম্পেইন’ বন্ধ হয়ে যাওয়া। সাধারণত শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে এই টিকার দুই ডোজ দেওয়া হয়। আগে যেসব শিশু টিকাকেন্দ্রে আসতে পারত না, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, অতীতে নিয়মিত সার্ভিল্যান্স ও তদারকি কার্যক্রম জোরালো ছিল। অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) থেকে এসব কার্যক্রমের ব্যয় বহন করা হতো। তবে ২০২৫ সালে ওপি বাতিল হওয়ায় মাঠপর্যায়ের অনেক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তার ভাষায়, শুধু টিকাকেন্দ্রে আসা শিশুদেরই টিকা দেওয়া হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান বা বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। এতে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। বিশেষ করে দেশের যে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো বাড়িতে জন্ম নেয়, তারা বঞ্চিত হয়েছে টিকা থেকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান কালবেলাকে বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। কিছু এলাকায় বেশি হলেও সার্বিকভাবে সংক্রমণ বাড়তির দিকেই। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইসিইউ সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, আগামী জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে এই ক্যাম্পেইন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। আগামী মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ২ কোটি সিরিঞ্জ পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই কর্মসূচি শুরু করা হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশে হামের রোগী বেড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে এবং আইসিইউ সুবিধাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দেশপক্ষ/ এমএইচ








