
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগের নাম জ্বালানি তেল। হঠাৎ করে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে একলাফে তেলের দাম যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কিন্তু এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব কেবল পেট্রোল পাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ভাতের থালা থেকে শুরু করে গণপরিবহনের ভাড়া পর্যন্ত।
সরকার গত কয়েক দফায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম যেভাবে বাড়িয়েছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিশেষ করে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন মূল্যতালিকা সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যতালিকা:
ডিজেল: ১১৫ টাকা (প্রতি লিটার) — বেড়েছে ১৫ টাকা।
কেরোসিন: ১৩০ টাকা (প্রতি লিটার) — বেড়েছে ১৮ টাকা।
অকটেন: ১৪০ টাকা (প্রতি লিটার) — বেড়েছে ২০ টাকা।
পেট্রোল: ১৩৫ টাকা (প্রতি লিটার) — বেড়েছে ১৯ টাকা।
এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক তেল পাননি। পাম্প মালিকদের ‘তেল নেই’ অজুহাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। সরকার এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই দিলেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে অনেক। যখন বিশ্ববাজারে দাম কমে, তখন কেন আমাদের দেশে তার প্রতিফলন ঘটে না? এছাড়া, বিপিসি গত কয়েক বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে, সেই আপদকালীন তহবিল কেন এই সংকটে সাধারণ মানুষকে ভর্তুকি দিতে ব্যবহৃত হলো না, তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা। তেল আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে জনগণের ওপর সরাসরি চাপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বৈশ্বিক মন্দার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও বিকল্প জ্বালানি উৎস বা ডলার সাশ্রয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে সরকারের গাফিলতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
জ্বালানির দাম বাড়ার সরাসরি অর্থ হলো সবকিছুর দাম বাড়া। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষি সেচ খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়বে চালের দামে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়ায় সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার এখন আগুনের মতো উত্তপ্ত। মানুষের এই ক্ষোভ কেবল তেলের দাম নিয়ে নয়, বরং জীবনযাত্রার মানের চরম অবনতি এবং সরকারের জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এখন জনবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।
একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। সেই জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা মানেই পুরো দেশের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়া। সরকারকে অতি দ্রুত সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর হতে হবে এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে তেলের দাম পুনর্বিবেচনা করতে হবে। নতুবা, এই পুঞ্জীভূত জনবিক্ষোভ বড় কোনো সামাজিক অস্থিরতার রূপ নিতে পারে, যা সামাল দেওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ