
জাতীয় জীবনে এমন কিছু ট্র্যাজেডি আসে যা কেবল আমাদের শোকাতুর করে না, বরং রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক কাঠামোর চরম ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করে দেয়। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের ওপর সেই ভয়াবহ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা আর দগ্ধ শিক্ষার্থীদের আর্তনাদ আমাদের জাতীয় স্মৃতির এক দগদগে ক্ষত।
সেদিন দুপুর ১টার কয়েক মিনিট পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সরাসরি মাইলস্টোন কলেজের জুনিয়র সেকশন ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পাইলট ও দুই জন শিক্ষিকাসহ মোট ৩৭ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল নিষ্পাপ শিক্ষার্থী। এছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৭৩ জন ভয়াবহভাবে দগ্ধ ও গুরুতর আহত হন। যদিও নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে জনমনে ও গণমাধ্যমে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।
তবে সেই ক্ষতে নুনের ছিটা দিয়ে সম্প্রতি এক ভয়ংকর তথ্য প্রকাশ করেছেন একজন সংসদ সদস্য । ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ অনুষ্ঠানে তিনি যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন, তা শুনে পুরো দেশ আজ স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। তিনি জানিয়েছেন, মাইলস্টোনের দগ্ধ শিশুদের জীবন বাঁচাতে যখন বাংলাদেশের বার্ন চিকিৎসার পথিকৃৎ অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন নিজে আত্মগোপন থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং সাংসদ নিজে মেসেজ পাঠিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই প্রস্তাবের কথা জানিয়েছিলেন—তখন ড. ইউনূসের সরকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর ড. ইউনূস এবং তাঁর প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকা আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। দেশবাসী আজ প্রশ্ন তুলছে মুমূর্ষু শিশুদের জীবনের চেয়ে কি রাজনৈতিক ‘ইগো’ বড় ছিল? ডা. সামন্ত লাল সেন এদেশের দগ্ধ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন—এই ঠুনকো অজুহাতে তাঁকে জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাধা দেওয়া ছিল এক চরম অমানবিক কাজ। ঐ সাংসদ একে সরকারের ‘ঘাড়ত্যারামি’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল এক ধরণের ‘প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা’।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ সর্বত্রই এখন এই হীন মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ প্রশ্ন তুলছে, যে সরকার শিশুদের সুচিকিৎসার অধিকার কেড়ে নিতে পারে, তারা কীভাবে সংস্কারের দাবিদার হয়? দগ্ধ শিশুরা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, তখন তৎকালীন সরকার তাদের সুচিকিৎসার চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব মেলাতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তা গ্রহণ করা হলো না, তার জবাবদিহি ড. ইউনূসের সরকারকেই করতে হবে। এটি কেবল অবহেলা নয়, বরং এক ধরণের ‘পরিকল্পিত অপরাধ’।
মাইলস্টোনের সেই কান্নার আওয়াজ আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। ড. ইউনূস ও তাঁর সরকারের এই একগুঁয়েমি ইতিহাসের পাতায় এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে। আমরা এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। মনে রাখতে হবে, রাজনীতি চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু জীবন চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। শিশুদের রক্ত আর চোখের জলের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো আদর্শই কখনও জয়ী হতে পারে না।
(মানিক লাল ঘোষ :– সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন)
দেশপক্ষ/ এমএইচ