
দেশজুড়ে হঠাৎ করে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড,নারী ও শিশু-ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে। পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধসহ বিভিন্ন কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। মানুষ নামে নরপিশাচের টার্গেট থেকে বাদ পড়ছেন না স্কুল-কলেজের ছাত্রী, গামের্ন্টকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার নারীরা। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে দেশের নাগরিক সমাজ। তবে ব্যাপক সমালোচনার পর ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। এতে জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে ৯ মে গাজীপুরে নারী ও তিন শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ময়মনসিংহে অপহরণের পর শিশুহত্যা, নরসিংদীতে শিশু নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা, চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি এবং বিভিন্ন জেলায় পারিবারিক সহিংসতাজনিত হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষই পরিণত হচ্ছেন হত্যার শিকার বা অভিযুক্তে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের গভীর সংকেত দিচ্ছে। একইসঙ্গে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া হত্যা,ধর্ষণ,অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির পথে। যা নিয়ে সর্বত্র বাড়ছে উদ্বেগ-উদ্বকণ্ঠা। তারা এও বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর আতঙ্ক, আর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে থাকার সরকারি দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটা। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করলেও, মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সাধারণ মানুষ।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ছয়জন। মব সহিংসতায় নিহত ২২ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ জন নারী ও শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন। একই সময়ে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে শুধু রাজধানীতেই ৫৭টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কিশোর গ্যাং সংঘর্ষ, জমিজমা বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮৪০ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সর্বশেষ রোববার বিকেল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানাধীন দেওয়ানজী পুকুরপাড় এলাকায় নিজ বাসা থেকে পলি চৌধুরী (৪৬) নামে এক স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মরদেহে পচন ধরেছে এবং শরীর কিছুটা ফুলে গেছে। কোতোয়ালি থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক রাশেদ বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তারা খবর পান যে, বাসার ভেতর থেকে দরজা খোলা হচ্ছে না। তিনি বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা খোলা হয়। পরে ঘরের ভেতরে ফ্লোরে শোয়া অবস্থায় তাকে মৃত পাওয়া যায়। মরদেহ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পলির বোন জানান, ফোনে যোগাযোগ না হওয়ায় তারা বাসায় এসে দরজা বন্ধ দেখতে পান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে কল দিয়ে পুলিশের সহায়তা নেন। এরআগে ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে বহুতল একটি বাড়ি থেকে এক নারী, তাঁর তিন সন্তান ও নারীর ভাইসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই নারীর স্বামী ফোরকান মিয়া (৪০) পলাতক। ফোরকান নিজে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে স্বজনদের কল করে জানান। রাউৎকোনা গ্রামের মো. মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের মো. আতিয়ার রহমানের ছেলে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩০), মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) ও শ্যালক গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের রসুল মিয়া (২২)। ফোরকানের পরিবার প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকত। ফোরকান প্রাইভেট কার চালাতেন। আর তাঁর শ্যালক রসুল গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় চাকরি করতেন। তবে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালিগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা ধারণা করছি, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান এ ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন। ঘরের ভেতরে অনেক আলামত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৯ মে দুপুরে অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানেটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সী এক শিশু, যার মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়। শিশুটি এখন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে তার স্বামী পলাতক রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই দুঃখজনক। পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আগে থেকে প্রতিরোধ করা অনেক সময় কঠিন হলেও পুলিশ প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে কাজ করছে। তবে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও আইনানুগ অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেই বিষয়েও পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ধর্ষণ ছাড়াও নারীকে হেনস্তা ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। পাশাপাশি গণপরিসরে নারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব ঘটনা নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, স্বাধীন চলাচল ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার বড় অংশ পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাত থেকে সৃষ্টি হচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অর্থনৈতিক বিরোধ, সম্পর্কজনিত দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক সহনশীলতার ঘাটতি সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। তিনি বলেন, উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা পরিচিতজন। এটি সামাজিক সম্পর্কের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলে সহিংসতা কমানো কঠিন হবে।
দেশপক্ষ/ এমএইচ