
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আলোড়নে অনেক সময়ই আবেগের আতিশয্যে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য ধূলিসাৎ করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সাময়িক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে যে অর্জনগুলো রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছিল, সেগুলোকে মুছে ফেলার চেষ্টা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক অনন্য দিন ছিল, যেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ‘জুলিও-কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে। এটি কেবল একজন নেতার ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ছিল না, বরং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল রূপান্তর ঘটেছে। এই পরিবর্তনের আবহে কোনো কোনো মহল থেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত বা অতি-উৎসাহে ইতিহাসের পাতা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম ও তাঁর বৈশ্বিক অর্জনগুলোকে মুছে ফেলার কিংবা অবমূল্যায়ন করার একটি সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস কোনো পেন্সিলে লেখা খসড়া নয় যে ক্ষমতার পালাবদলে তা মুছে ফেলা যাবে। বিশেষ করে, বর্তমান যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সেই সময়কার নীতি ও দর্শন আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক মহান মানবিক ইতিহাস। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যারি কুরি ও পিয়েরে কুরি দম্পতির সুযোগ্য কন্যা আইরিন জুলিও-কুরি এবং তাঁর স্বামী ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি—উভয়েই ছিলেন নোবেলজয়ী পরমাণু বিজ্ঞানী। কিন্তু বিজ্ঞানকে তাঁরা মানববিধ্বংসী কাজে ব্যবহারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং aggression দেখে এই বিজ্ঞানী দম্পতি নিজেদের বিশ্ব শান্তির সংগ্রামে নিয়োজিত করেন। ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি ছিলেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি। ১৯৫৬ সালে আইরিন জুলিও-কুরির মৃত্যুর পর, মানবতার কল্যাণে এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শান্তিকামী আন্দোলনে বিজ্ঞান ও চেতনার এই মেলবন্ধনকে চিরস্মরণীয় করতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাঁদের যৌথ নামানুসারে ‘জুলিও-কুরি’ শান্তি পদক প্রবর্তন করে।
ফিদেল কাস্ত্রো, হো চি মিন, ইয়াসির আরাফাত, নেলসন ম্যান্ডেলা, ইন্দিরা গান্ধী এবং মার্টিন লুথার কিং-এর মতো বিশ্ব কাঁপানো শান্তিকামী নেতাদের পাশে বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যুক্ত হওয়াটা ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক পরম গৌরব। বাঙালির অধিকার আদায়ে ১৯৪৮ ও ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক বজ্রকণ্ঠ “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—সবখানেই প্রকাশ পেয়েছিল শোষিতের মুক্তির আকুলতা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি যে পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ শান্তির সপক্ষে।
স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে ‘জোট নিরপেক্ষ নীতি’ বেছে নেন। তাঁর ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।”
তৎকালীন বিশ্বনেতাদের অস্ত্র প্রতিযোগিতার সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তিগুলো যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে। কেবল আন্তর্জাতিক মণ্ডপেই নয়, নিজের রাজনৈতিক দর্শনেও তিনি ছিলেন অবিচল। ১৯৭৩ সালে জুলিও-কুরি পদক গ্রহণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন—”বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত—শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।”
এই মানবিক ও শান্তিকামী দর্শনের কারণেই ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভায় বঙ্গবন্ধুকে এই পদক দেওয়ার প্রস্তাব করেন পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র। পরে ১৯৭৩ সালের ২৩ মেঢাকার মাটিতে এক আন্তর্জাতিক সমাবেশের মাধ্যমে তাঁর বুকে পরিয়ে দেওয়া হয় ‘জুলিও-কুরি’ পদক। সেদিন রমেশ চন্দ্র আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, “শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।”
আজকের বিশ্ব পরিস্থিতি যদি আমরা লক্ষ্য করি—ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান বর্বরতা, কিংবা পরাশক্তিগুলোর ভেতরের তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ—পুরো পৃথিবী আজ এক চরম অশান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরাশক্তিগুলো যখন জনকল্যাণের চেয়ে মারণাস্ত্র তৈরিতে বিপুল অর্থ ঢালছে, তখন বঙ্গবন্ধুর সেই ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিপক্ষে এবং মানবকল্যাণের পক্ষে’ দেওয়া বক্তব্যটি কতটা দূরদর্শী ছিল, তা আজ বিশ্বনেতারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বাংলাদেশ যখন বর্তমান বিশ্বমঞ্চে নিজেকে একটি শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে আমাদের সেনারা যখন বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করে, তখন আমাদের নৈতিক শক্তির মূল উৎস কিন্তু এই ‘জুলিও-কুরি’ পদক এবং বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল এই বৈশ্বিক অর্জনটিই।
রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা বা ক্ষমতার পালাবদল একটি গণতান্ত্রিক দেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু তা যদি হয় দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়ার অংশ, তা যেকোনো জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। প্রতিকূল রাজনৈতিক আবহ বা প্রতিহিংসার বশে যদি রাষ্ট্রের প্রথম আন্তর্জাতিক অর্জন কিংবা বিশ্বমঞ্চে দেশের গৌরবগাথাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, দেশের রাজনৈতিক চালচিত্রও বদলে গেছে। কিন্তু শোষিতের পক্ষে এবং শান্তির সপক্ষে তাঁর যে বৈশ্বিক দর্শন, তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা দলের নয়—তা চিরন্তন। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই চলে; সাময়িক কুয়াশা দিয়ে সূর্যের আলোকে যেমন ঢেকে রাখা যায় না, তেমনই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্যকেও মুছে ফেলা অসম্ভব। বিশ্বশান্তির আলোচনা যতদিন থাকবে, ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবে বাংলাদেশের এই অর্জনও ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে।
( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ