
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা কেবল তার ভৌগোলিক সীমানা বা শাসনতন্ত্র দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং সেই জাতি তার মহান সন্তানদের বিদায়লগ্নে কতটা শ্রদ্ধাশীল, তার ওপরই নির্ভর করে ওই জাতির মানস ও নৈতিক উচ্চতা। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম তোফায়েল আহমেদ—যিনি ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, তৎকালীন ডাকসুর তুখোড় ভিপি এবং বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম প্রধান রূপকার। তিনি মুজিব বাহিনী গঠনেও রেখেছিলেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে শুরু করে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দলের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বেশ কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যিনি জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, সেই মহান নেতার শেষ বিদায়লগ্নে রাষ্ট্র এক নজিরবিহীন উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে।
মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে যে আইনি হয়রানি চালানো হয়েছে এবং নিজ জেলা ভোলা—যেখানে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে তাঁর উন্নয়নের ছোঁয়া—সেই ভোলার মাটিতে জানাজায় বিএনপির স্থানীয় সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে যে নক্কারজনক বাধা প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে, তা কেবল এক ব্যক্তির অপমান নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় রাজনীতির চরম সংকীর্ণতা ও দেউলিয়াত্বের এক নির্মম দলিল।
রাষ্ট্রের এই বৈরী আচরণের বিপরীতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১ জুনের জানাজায় ছিল এক অন্যরকম দৃশ্যপট। হাজারো শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকার সেই প্রথম জানাজায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান “জয় বাংলা” দিয়ে। যে মহানায়ক আজীবন রাজপথে লড়াই করেছেন, সেই বীরকে সেদিন নেতাকর্মীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে আর অগ্নিঝরা শ্লোগানে বিদায় জানিয়েছেন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, সেই জানাজা শেষে যখন জাতি শোকাভিভূত, ঠিক তখনই অগণিত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি অভিযান চালিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। যে মানুষটি আজীবন মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন, তাঁর বিদায়লগ্নে তাঁর অনুসারীদের ওপর এই দমন-পীড়ন ক্ষমতার চরম দম্ভেরই বহিঃপ্রকাশ।
তোফায়েল আহমেদ কোনো নির্দিষ্ট দলের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের সংসদীয় রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান থেকে শুরু করে স্বাধীনতার প্রতিটি লড়াইয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। রেকর্ড সংখ্যক ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন জনগণের সাথে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক কত গভীর। যে সংসদকে তিনি দশকের পর দশক নিজের প্রজ্ঞা ও ক্ষুরধার যুক্তিতে মুখরিত রেখেছেন, সেই জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে তাঁর শেষ বিদায়ের আয়োজনটুকু না হওয়া কেবল এক প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতির এক গভীর ক্ষত। যেখানে একজন বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ানের প্রতি ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার প্রদর্শিত হয়নি, সেখানে এটি স্পষ্ট যে, সংকীর্ণতা আমাদের নীতিনির্ধারণী স্তরে কতটা বাসা বেঁধেছে।
ব্যথিত হওয়ার এখানেই শেষ নয়। বাঙালির ভাষা ও চেতনার প্রতীক—কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে নাগরিক শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগটুকুও কেন দেওয়া হলো না, সেই প্রশ্ন আজ সচেতন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এরপর ভোলার মাটিতে তাঁর শেষ বিদায়লগ্নে যে প্রতিহিংসামূলক আচরণ ও বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে, তা কেবল একজন জাতীয় নেতার প্রতি অপমান নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক নৈতিকতার চরম পরাজয়।
অথচ তোফায়েল আহমেদ নিজে ছিলেন এক উদার ও পরমতসহিষ্ণু রাজনীতির প্রতীক। চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগেও তিনি যেভাবে ব্যক্তিগত সৌজন্য বজায় রেখে চলতেন, তা ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। আজ যখন তাঁকে এবং তাঁর আদর্শকে সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রতিপক্ষ এমন দেউলিয়াত্বের পরিচয় দেয়, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আমরা এক কতটা অসহিষ্ণু সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের ভাষায়, “রাজনীতি হলো সর্বোচ্চ মানবিক কল্যাণ সাধনের শিল্প।” তোফায়েল আহমেদ আজীবন সেই শিল্পকেই চর্চা করেছেন। যে মানুষটি নিজের প্রতিপক্ষকেও সর্বদা সম্মানের চোখে দেখেছেন, বিদায়বেলায় রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে ন্যূনতম নাগরিক সম্মানটুকু না দিয়ে নিজেদের দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করেছে। ইতিহাসের অমোঘ সত্য হলো, সাময়িক রাষ্ট্রীয় অবহেলা কিংবা সংকীর্ণতার দেয়াল দিয়ে তোফায়েল আহমেদের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বকে ম্লান করা সম্ভব নয়। তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে থাকবেন অমর হয়ে। তবে, তাঁর জানাজায় বাধা প্রদান, আইনি হয়রানি এবং শহীদ মিনার ও সংসদ থেকে বঞ্চিত করার এই কলঙ্কিত অধ্যায় ইতিহাসের পাতায় এক চরম ধিক্কার হিসেবেই লেখা থাকবে। বীরদের সম্মান দিতে না জানা জাতি যে নতুন কোনো বীরের জন্ম দেওয়ার নৈতিক অধিকার রাখে না— এই সত্যটিই আজ আবারও প্রমাণিত হলো।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ