
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঘিরে যে তথাকথিত ‘আদর্শিক আভিজাত্য’ ও পরিবর্তনের স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছিল, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আজ সেই অধ্যায়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা ও লুটপাটের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলের নেতারা যে সতর্কবার্তা বারবার উচ্চারণ করেছিলেন—আজকের বাস্তবতা যেন সেই সত্যকেই অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেন সেই দূরদর্শী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণেরই এক অকাট্য দর্পণ।
টিআইবির ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদনটি কেবল একটি পরিসংখ্যানের খাতা নয়, এটি যেন একটি শাসনামলের ব্যর্থতার দলিল। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, সেই সরকারের আমলে কেবল সেবা খাতেই ঘুষ হিসেবে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এই শাসনামলে লুটপাটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি, জনকল্যাণমূলক খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছিল, যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলই ছিল প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। এর ফলে দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান গত দেড় বছরে ১২ ধাপ পিছিয়ে গিয়েছিল, যা ওই সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতারই চূড়ান্ত প্রমাণ।
সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইউনূস সরকারের আমলেই দুর্নীতি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী যখন সরকারের ভেতরে থেকেই এমন কঠোর সত্য উচ্চারণ করেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সেই সময় রাষ্ট্রকে কোন চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
শেখ হাসিনা যখন অনেক আগে থেকেই ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন, তখন একটি মহল তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যায়িত করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু আজ টিআইবির পরিসংখ্যান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সত্য উচ্চারণ প্রমাণ করছে যে, শেখ হাসিনার সেই পর্যবেক্ষণ ছিল আগাম সংকেত মাত্র। রাজনীতির মাঠে সত্য কখনো কখনো বিলম্বে প্রকাশিত হয়, কিন্তু তা অবিনশ্বর।
পরিশেষে বলা যায়, টিআইবির প্রতিবেদনটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি অগণতান্ত্রিক শাসনামলের ব্যর্থতার দলিল। ড. ইউনূস সরকার যাদের দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তারা আজ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট—ইউনূস সম্পর্কে শেখ হাসিনা সবার আগে যা বলেছিলেন, আজ জাতি তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। রাষ্ট্রের স্বার্থে এখন প্রয়োজন সেই আমলের প্রতিটি দুর্নীতির দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা, যাতে করে দেশের তলাবিহীন ঝুড়ির গর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়।
(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ