রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের মূর্তিমান আতঙ্কের নাম সালাহউদ্দিন আম্মার। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটিকে মব সন্ত্রাসের পাঠশালায় পরিনত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হবার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এ ছাত্রনেতা। শিক্ষক, প্রক্টও , সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর একের পর এক মব সন্ত্রাস করে নির্যাতন করছেন তিনি। ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো শিক্ষার্থীও জড়িত থাকার তথ্য পেলেই তার উপর আম্মার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন নেমে আসছে। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রয়েছে জঙ্গি সম্পৃক্তার অভিযোগও। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল ও শিক্ষক নেতারা একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং দিনদিন আরো বেপরোয়া উঠছেন আম্মার ও তার অনুসারীরা।
রাবি প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে কোটায় ভর্তি হন সালাহউদ্দিন আম্মার। খুলনার প্রত্যন্ত কয়রা উপজেলার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি শান্ত স্বভাবের ছিলেন, নিয়মিত ক্লাস করতেন এবং হোস্টেলে থাকতেন। প্রায়ই ছাত্রলীগের হল নেতাদের সঙ্গে তার চলাফেরা ছিল। গোপনে শিবির করলেও তা কখনো প্রকাশ্যে আনেননি। মূলত ছাত্রলীগের সঙ্গে গুপ্ত চরিত্রে মিশে থাকতেন।

২০২৪ সালে কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হলেও সামনে আসতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে শিবিরের হয়ে আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসেন। ৫ আগস্ট তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবার পর নিজের আসল চেহারা সামনে নিয়ে আসেন। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাকসু তথা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ফেলছেন ভাবমূর্তির সংকটে। কখনো শিক্ষকের শার্টের কলার ধরছেন, কখনো উপাচার্যের কার্যালয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন তালা, আবার কখনো ছাত্রদল নেতাকে ছাত্রলীগ তকমা দিয়ে পিটিয়ে করছেন আহত। তার বিরুদ্ধে উঠেছে চাঁদাবাজি এবং নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগও। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য ফৌজদারি অপরাধে জড়ানোর পরও আম্মারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। সব ঘটনাতেই পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখাচ্ছে নীরবতা।
গত সোমবার ক্যাম্পাসে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পিটিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আম্মার। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তার নেতৃত্বে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রথম দফায় প্রক্টরের দপ্তরে তিন শিক্ষার্থীকে (আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল) মারধর করেন। পরে বেলা ৩টার দিকে রাকসু ভবনে গিয়ে আম্মার এবং রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুস সাকিবের ওপর পাল্টা হামলা চালান তারা। এরপর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রক্টরের সামনেই কয়েক দফা আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে মারধর করেন আম্মার এবং তার অনুসারী শিবির নেতাকর্মীরা। হামলাকারীরা কাঠ, বাঁশ, রড, বেলচা দিয়ে তাদের বেধড়ক পেটান। হামলা ঠেকাতে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় উল্টো মারধরের শিকার দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অথচ আম্মার বা তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজ উপজেলা কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান মহসিন রেজা নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন এ আম্মার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহসিন রেজা কোথাও যান নি। নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। একাধিকবার সবাই বললেও যাননি।উনি বলেছিলেন আমি কারো ক্ষতি করিনি,আমার কোনো শত্রু নেই তাই আমি বাড়ি ছেড়ে যাব না।
মহসিন রেজার স্বজনদের অভিযোগ ঘটনার দিন মহসিন চেয়ারম্যানের বন্দুক দিয়েই তাকে গুলি করেন আম্মার ।তবুও উনি মারা যাননি। তারপরে গণহারে পিটানোর একটা পর্যায়ে উনি শেষ মুহূর্তে পানি চেয়েছিলেন। পানির পরিবর্তে পেট্রোল খাওয়ান আম্মার।পুরো শরীরে পেট্রোল ঢেলে কম্বল পেঁচিয়ে পুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর উপজেলা চেয়ারম্যান মহসিন রেজার বন্দুক নিয়ে কয়রা বাজারের একটা দোকানে ফটোস্যুট করেন আম্মার এবং নিজেই তার ফেইসবুকে শেয়ার করেন।

পজেলা চেয়ারম্যান মহসিন রেজার বন্দুক নিয়ে কয়রা বাজারের একটা দোকানে ফটোস্যুট করেন আম্মার এবং নিজেই তার ফেইসবুকে শেয়ার করেন
এছাড়া ৫ আগস্টের পর এক দশক আগে হামলায় পা হারানো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। পিটিয়ে হত্যার সময় ঘটনার নেতৃত্ব দেন এই আম্মার।
‘৩৬ জুলাই: মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের নামে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা অনুদান চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আম্মার। তা জানাজানি হলে চরম বিতর্কিত হন তিনি। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী রাবির এক শিক্ষকের ভাষ্য, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল আম্মারের। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে অনেকের নিয়োগের নেপথ্যে আম্মারের তদবির ছিল। নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়েছেন তিনি। ৫ আগস্টের পর নগর ভবন থেকে ল্যাপটপ লুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রাজশাহীর একটি শিল্পগ্রুপ এক এনসিপি নেতার (সাবেক শিবির নেতা) মাধ্যমে আম্মারের কাছে নিয়মিত মাসোহারা পৌঁছে দেয় বলেও রয়েছে অভিযোগ। বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে লতিফ হল ছাত্র সংসদের জিএস নুরুল ইসলাম শহিদকে মারধর করেন আম্মার।
গত বছরের শেষের দিকে ভর্তিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ইস্যুতে আন্দোলনের সময় তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনসহ কয়েকজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেন আম্মার। রেজিস্ট্রারের দপ্তরে ঢুকেও হাঙ্গামা করেছেন আম্মার ও তার অনুসারীরা। প্রথম আলো-ডেইলি স্টারসহ বেশ কিছু গণমাধ্যমকে ‘সুশীল’ আখ্যা দিয়ে বন্ধের হুমকি দিয়েও হন আলোচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগপন্থী কোনো শিক্ষক-কর্মকর্তা চাকরিতে থাকলে তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখার হুমকি দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় ডিনকে পদত্যাগ করতে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় হুমকি দেন আম্মার। একই সঙ্গে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখার হুঁশিয়ারি দেন। এরপর ২১ ডিসেম্বর তিন ডিনের কার্যালয়, উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দপ্তরে তালা লাগিয়ে দেন তিনি।
রাবি সূত্র জানায়, শিবিরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেও আম্মারের জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি ও তার অনুসারীদের কাছে আধুনিক অস্ত্রভান্ডার রয়েছে। কিন্তু সব কিছু জেনেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং রাজশাহী পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে আম্মারের ঘণিষ্ঠ সর্ম্পক থাকায় তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি বললেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হয়ে সে (আম্মার) বারবার ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করে তুলছে। কার প্ররোচনায়, কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতার মিল রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবকিছু বের করা দরকার।’
এ প্রসঙ্গে রাবির আইন বিভাগের শিক্ষক ড. মোর্শেদুল আলম পিটার বলছিলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী যদি অন্য কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করে কিংবা প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দেয়, তবে তা স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ বা জিডি করা এবং আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। হুমকি দেওয়া বা আঘাত করার মতো বিষয়গুলো আইনের আওতায় বিচারযোগ্য।’
এর আগে আম্মারের আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। ফোরামের বিবৃতিতে বলা হয়, যখন-তখন বিভিন্ন দপ্তরে তালা লাগিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণের মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসে ভীতিকর ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন আম্মার।