
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট দুটি আলাদা তারিখ হলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে এ দুটি দিন গভীরভাবে পরস্পর যুক্ত। একটি দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল, আর অন্য দিনে তাঁর কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল বলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মূল্যায়নে বলা হয়। সময়ের ব্যবধান ২৯ বছর হলেও দুটি ঘটনার মধ্যকার রাজনৈতিক অভিঘাত আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে অনুভূত হয়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা শেষের পথে। ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শেষ করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁকে ঘিরে হাজারো নেতাকর্মী। ঠিক সেই মুহূর্তে পরপর গ্রেনেড বিস্ফোরণে মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো দৃশ্য। মানুষের উচ্ছ্বাস পরিণত হয় আর্তনাদে, রাজপথ ভরে যায় রক্তে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু ও আতঙ্ক।
হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকে শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার এবং মনে স্বজন হারানোর অসহনীয় বেদনা নিয়ে পরবর্তী জীবন কাটিয়েছেন।
সেদিন শেখ হাসিনাকে ঘিরে নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে তাঁকে রক্ষা করেন। গ্রেনেডের আঘাতে তিনি আহত হন এবং তাঁর শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার পর তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়। নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ ও নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
একুশে আগস্টের শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আইভি রহমান। গ্রেনেডের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ২৪ আগস্ট তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু একুশে আগস্টের বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফও সেদিন গুরুতর আহত হন। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর পরবর্তী সময়ে তিনিও মারা যান।
নিহতদের মধ্যে আইভি রহমান ছাড়াও শেখ হাসিনার নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম ওরফে আদা চাচা, রতন শিকদার, হাসিনা মমতাজ রিনা, রেজিয়া বেগম, সুফিয়া বেগম, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আবুল কালাম আজাদ, আব্বাস উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন সরদার, আবুল কাশেম, বেলাল হোসেন, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, জাহেদ আলী, মোতালেব হোসেন, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোমেন আলী ও ইসহাক মিয়াসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী প্রাণ হারান। বিভিন্ন প্রকাশিত তালিকায় কয়েকজনের নাম ও পরিচয়ে কিছু পার্থক্যও দেখা যায়।
সেদিনের হামলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাও আহত হন। শেখ হাসিনার পাশাপাশি আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, সাহারা খাতুন, অধ্যাপক আবু সাঈদ ও এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ অনেকে আহত হন। আরও আহত হন নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, মাহবুবা পারভীন, উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দীপ্তি, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন ও মামুন মল্লিকসহ অসংখ্য নেতাকর্মী। সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাংবাদিকও সেদিন আহত হন।
কিন্তু একুশে আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায়কে শুধু ২০০৪ সালের একটি দিনের ঘটনা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা আড়ালে থেকে যায়। সেই ধারাবাহিকতার শুরু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মূল্যায়নে ২১ আগস্ট সেই রক্তাক্ত ইতিহাসেরই পরবর্তী অধ্যায়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিপর্যস্ত করার যে চেষ্টা হয়েছিল বলে দলটি মনে করে, ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যও ছিল—এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে উঠে এসেছে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ, বারবার হামলা ও হত্যাচেষ্টার মধ্যেও তিনি দলকে সংগঠিত করেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
এই কারণেই ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাকে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের একটি বড় অংশ নেতৃত্বশূন্য করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে। তাঁদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায়, ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল, ২১ আগস্টে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে সেই রাজনৈতিক ধারাকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের মধ্যে তাই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। একদিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে তাঁর কন্যার ওপর হত্যাচেষ্টা—দুটি ঘটনাই আওয়ামী লীগের কাছে তাদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ আঘাতের প্রতীক।
তবে ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা দাবি করে, রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি তদন্ত ও বিচারিক ইতিহাসকেও বিবেচনায় রাখা। ২১ আগস্ট হামলার তদন্তের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। জজ মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেই তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ২০০৭ সালের পর মামলার তদন্ত নতুন দিকে মোড় নেয়। হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে সামনে আসে।
মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে ২০১৮ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ওই রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অভিযোগেও কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলার বিচারিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন। পরে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন।
এই বিচারিক পরিবর্তনের ফলে একুশে আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বহু প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে রয়েছে ২৪টি প্রাণের মৃত্যু, শত শত মানুষের আহত হওয়ার বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিযোগ; অন্যদিকে রয়েছে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়, সাক্ষ্য ও আলামত নিয়ে প্রশ্ন এবং সর্বশেষ আদালতের খালাসের সিদ্ধান্ত। ফলে ২১ আগস্টের ঘটনার পূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখনও বাংলাদেশের ইতিহাস ও জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য—একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো স্বাভাবিক অংশ হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার অধিকার জনগণের। সেই সিদ্ধান্ত আসবে ভোটের মাধ্যমে, যুক্তির মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড থেকে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তাই শুধু অতীতের ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও একটি কঠিন সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষত কোনো একটি দল বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার অভিঘাত পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনাকে প্রভাবিত করে।
১৫ আগস্টে হারিয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২১ আগস্টে হারিয়েছি আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে। শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন, অসংখ্য মানুষ আজীবনের জন্য বয়ে বেড়ান স্প্লিন্টারের ক্ষত। এই মৃত্যুগুলো কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; প্রতিটি প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত জীবনকাহিনি।
তাই ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের স্মরণ কেবল শোক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ইতিহাসের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, নিহত ও আহতদের স্মৃতি ধারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করার চিন্তাও স্থান পাবে না।
রাজনীতির লড়াই হবে আদর্শের সঙ্গে আদর্শের, যুক্তির সঙ্গে যুক্তির এবং জনগণের রায়ের সঙ্গে জনগণের রায়ের। গ্রেনেড, গুলি কিংবা হত্যার মাধ্যমে নয়। ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের সেই কঠিন সত্যই মনে করিয়ে দেয়—নেতৃত্বকে হত্যা করা যায়, মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করা যায় না।
ইতিহাসের রক্তাক্ত পৃষ্ঠা মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা যায়। ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের শহীদদের প্রতি সবচেয়ে গভীর শ্রদ্ধা হতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকার, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, ক্ষমতার পালাবদল থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নামে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে না।
(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/এমএইচ