স্বাধীনতার পর পরই একটি সদ্য জন্ম নেওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা এবং বিশ্ববাসীর স্বীকৃতি অর্জন করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি এক গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দিন। সেদিনই বিশ্বসম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সংস্থা জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী ও সৃজনশীল কূটনীতির সুদূরপ্রসারী সাফল্য।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে পরিচিত করার যে মহাযজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ ছিল তারই এক অবধারিত পরিণতি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের স্বাক্ষরে জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবর পাঠানো সেই ঐতিহাসিক আবেদনপত্রটির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক পদচারণা শুরু হয়েছিল। এই পথপরিক্রমা সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর বৈরী মনোভাব এবং নিরাপত্তা পরিষদে নানা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে কিছু বাধা তৈরি হয়েছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব, বিশ্বনেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় সম্পর্ক এবং তাঁর শান্তিকামী পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা’—এই মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে সমস্ত বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ ঠিকই বিশ্বমঞ্চে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে নেয়।
১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করার পরপরই বিশ্বসভায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ বাংলায়। এটি ছিল বিশ্বসভায় মাতৃভাষা বাংলার প্রথম মর্যাদাপূর্ণ উচ্চারণ। সেদিন বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু কোনো আঞ্চলিক বা সংকীর্ণ স্বার্থের কথা বলেননি, বরং তিনি বিশ্বশান্তি, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি, এবং যুদ্ধ ও সংঘাত পরিহার করে একটি বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর সেদিনের সেই ভাষণ আজও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মানবতার এক অনন্য দলিল হিসেবে সমাদৃত।
পিতার সেই আদর্শ ও পথ ধরে পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন আমলেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ এক মর্যাদাবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেসময়ে বিশ্বশান্তি রক্ষা কার্যক্রমে শীর্ষস্থানীয় অবদান রাখা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। বৈশ্বিক নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের সেই কূটনৈতিক দূরদর্শিতা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে স্পষ্ট উপলব্ধি হয় যে, ১৯৭৪ সালের সেই ঐতিহাসিক সদস্যপদ লাভ কেবল একটি কূটনৈতিক স্বীকৃতি ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্বমঞ্চে আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অবিস্মরণীয় সূচনা। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন, আজ তা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা পালাবদল ঘটলেও বিশ্বসভায় বাংলাদেশের এই গৌরবময় সাফল্য ও অনন্য ভাবমূর্তি ভবিষ্যতেও যেন সর্বদা অব্যাহত থাকে—এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর আন্তরিক প্রত্যাশা।
(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)