
বাংলাদেশ আজ এক চতুর্মুখী জ্বালানি ও কৃষি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সারের সংকট আলাদা কোনো সমস্যা নয়, এগুলো একে অপরের সাথে শৃঙ্খলের মতো জড়িত। একটির দাম বাড়লে বা সরবরাহ কমলে বাকি তিনটির উপর সরাসরি আঘাত আসে, আর এর চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হয় দেশের সাধারণ মানুষ।
১. সংকটের মূল চিত্র:
ক) বিদ্যুৎ সংকট: দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, গ্যাস ও তেলের অভাবে গড়ে ১২-১৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং নিত্যদিনের ঘটনা।
খ) গ্যাস সংকট: দৈনিক চাহিদা ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ ২৬০০-২৮০০ মিলিয়ন। দেশীয় কূপের উৎপাদন কমছে, এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকট। ফলে সার কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা সবখানে গ্যাস রেশনিং চলছে।
গ) তেলের দাম বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ডিজেল, পেট্রোলের দাম কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ।
ঘ) সার সংকট: গ্যাসের অভাবে যমুনা, আশুগঞ্জ, এসপিডব্লিউ সার কারখানা বন্ধ। আমদানি করা সার বন্দরে আটকে থাকছে ডলার ও পরিবহন জটিলতায়।
২. প্রান্তিক চাষী থেকে ভোক্তা – কে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
প্রান্তিক চাষীর কান্না:
নওগাঁর একজন প্রান্তিক চাষীর হিসাব ধরুন। এক বিঘা জমিতে বোরো চাষে আগে ডিজেল লাগতো ৮০০ টাকা, এখন লাগে ১৩০০ টাকা। সরকারি দামে ইউরিয়া পাওয়ার কথা ২৭ টাকা কেজি, কালোবাজারে কিনতে হচ্ছে ৪২-৪৫ টাকায়। চাষের শুরুতে ৩০০০ টাকা বাড়তি খরচ। কিন্তু ধানের দাম বাড়ছে না। ফলে চাষী ঋণ নিচ্ছে, মহাজনের কাছে যাচ্ছে।
পরিবহন শ্রমিক ও দিনমজুর:
ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বেড়েছে ২৭%, ট্রাক ভাড়া ৩৫%। দিনমজুরের দৈনিক আয় ৫০০ টাকা, যাতায়াতেই চলে যায় ১০০ টাকা। রিকশাচালক, ভ্যানচালকের সংসারে টান পড়েছে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোক্তা:
নওগাঁ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক সবজি আনতে ভাড়া বেড়েছে ৭০০০ টাকা। এই খরচ যোগ হচ্ছে প্রতি কেজি বেগুন, আলু, পেঁয়াজের দামে। গত এক বছরে চালের দাম ১৫%, সয়াবিন তেল ২০%, ডিমের দাম ৩০% বেড়েছে। সীমিত আয়ের মানুষ আমিষ কমিয়ে দিচ্ছে, পুষ্টিহীনতা বাড়ছে।
শিল্প ও কর্মসংস্থান:
ছোট রাইস মিল, হিমাগার, গার্মেন্টস মালিকরা ডিজেল জেনারেটরের খরচ পোষাতে না পেরে শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। গ্রামে কর্মসংস্থান কমছে।
জ্বালানি ও সার কোনো দলীয় বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই অবিলম্বে এই চতুর্মুখী সংকট নিরসনে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হোক – এটাই কোটি মানুষের প্রাণের দাবি।
মোঃ আবু হাসান সিদ্দিকী মিলন
সাবেক ছাত্রনেতা,
*কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।