বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি রেমিটেন্স খাত। বিশ্বজুড়ে শ্রম বাজারে বাংলাদেশিদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। অন্তবর্তী সরকার আসার পর খাত সংশ্লিষ্টরা নতুন আশা দেখলেও ঘটেছে উল্টো। অর্থনীতির শক্তিশালী খাতটি সংকুচিত হয়ে আসছে। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ভিসা প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে সবুজ পাসপোর্ট মানে যেন আতঙ্ক। অন্তবর্তী সরকারের গত ১৫ মাসে ভিসা থাকার পরও সংশ্লিষ্ট দেশের এয়ারপোর্ট হতে ফেরত এসেছে অন্তত ৫ লাখ প্রবাসী ও পর্যটক। যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশির মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে সমালোচনার ঝড়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশির জন্য শ্রম বাজার নির্ভর প্রায় দেশ ভিসা বন্ধ রেখেছে। যার কারণে ট্যুরিস্ট ভিসার যেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানি, ফেরত পাঠানো, জেল-জরিমানর শিকার হচ্ছে সবুজ পাসপোর্টধারীরা। গত ১৫ মাসে শুধু মালয়েশিয়া হতে ফেরত পাঠানো হয়েছে অন্তত ১ লাখ ভিসাধারীকে।

ট্রাভেল খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণের জন্য ভিসা পাওয়া এখন আর আগের মতো সহজ নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য একের পর এক জনপ্রিয় গন্তব্য দেশ ভিসা সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই নানা অজুহাতে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এতে চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে বিদেশগামীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া সীমিত অথবা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে দেশের পর্যটন খাতে পড়ছে সরাসরি প্রভাব, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ট্যুর অপারেটর ও বিমান সংস্থাগুলো।
সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে মব সন্ত্রাস। প্রতিনিয়ত ঘটছে খুন ও ধর্ষনের ঘটনা। গোটা দেশ জুড়ে চলছে অনৈরাজ্য। অন্তবর্তী সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ। যা বাংলাদেশের ইমেজ বর্হিবিশ্বে ক্ষুন্নু করছে। যার কারণে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদান সংকীর্ন হয়ে যাচ্ছে।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চলতি বছরের জুলাই থেকে বন্ধ। ফলে চিকিৎসার জন্য যারা প্রতিবেশী দেশটিকে ভরসা করতেন, তাদের জন্য বিকল্প গন্তব্য হয়ে উঠেছিল থাইল্যান্ড। পাতায়া, ফুকেট, কিংবা রাতের ব্যাংকক এখনো জনপ্রিয় থাকলেও দেশটিতে ভিসা পেতে এখন কমপক্ষে ৪৫ দিন সময় লাগছে, যা আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ।
দুবাই কিছুদিন ভিসা বন্ধ রাখার পর সীমিতভাবে চালু করলেও এখনও সবাইকে ভিসা দিচ্ছে না। সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতেও ভিসা জটিলতা চলছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উজবেকিস্তানও ইলেকট্রনিক ভিসা সুবিধা থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ দিয়েছে।
দুবাইয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য, বিলাসবহুল হোটেল এবং বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার জন্য বাংলাদেশিদের কাছে এটি বরাবরই আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু গত জুলাই থেকে সাধারণ বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য দুবাইয়ের ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যত বন্ধ।
গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে ইউএই-তে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্দোলনের পর থেকেই বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের নতুন ভিসা ইস্যু বন্ধ রয়েছে। একাধিকবার কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি।
বর্তমানে শুধু নতুন ভিসা নয়, অভ্যন্তরীণ ভিসা ট্রান্সফারের সুবিধাও বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতিনিয়ত অবৈধ হয়ে পড়ছেন। অনেক কোম্পানি কাজ না থাকায় কর্মীদের ভিসা নবায়ন করছে না। অন্যদিকে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ পেলেও ভিসা ট্রান্সফার বন্ধ থাকায় চাকরির সুযোগ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভিয়েতনাম এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ছিল। অনেকেই ভিয়েতনাম ঘুরে পাশের দেশ লাওস ও কম্বোডিয়াতেও বেড়িয়ে আসতেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ভিয়েতনাম বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় আগে অন-অ্যারাইভাল’ ভিসা সুবিধা থাকলেও এখন সেটিও বিলম্বিত। বাংলাদেশি নাগরিকদের এখন এই ভিসা পেতে দুই মাসেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই অবস্থা ফিলিপাইনেও। আগে যেখানে ১০ দিনের মধ্যে ভিসা মিলতো, এখন তা পেতে দেড় মাস সময় লাগছে।
বাংলাদেশের জন্য চায়না ভিসা সহজলভ্য ছিল। বর্তমানে চায়না ভিসা কিছুটা সীমিত করেছে। ভিসা পেলেও চায়না ইমিগ্রেশন থেকে অনেককে ব্যাক দিচ্ছে।
ভিসা প্রক্রিয়া সীমিত করে এনেছে ক্রোয়েশিয়া। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনই কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটি দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন ক্রোয়েশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত অনাবাসী রাষ্ট্রদূত তারেক মোহাম্মদ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরার বলেন, বিদেশে যাদেরকে আটকানো হয় বা ফেরত পাঠানো হচ্ছে সেখান থেকেই তো ফলোআপ করা যায় তাদেরকে কারা পাঠিয়েছিল, কিভাবে পাঠিয়েছিল। এবং সেখানে গবেষকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা যোগসূত্র হওয়া দরকার। যার মাধ্যমে এটা আমরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অন্য দেশও এমন পথে হাটতে পারে বলে আশঙ্কা এই গবেষকের।
ইন্দোনেশিয়ার বালির মতো জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোর ভিসা প্রক্রিয়ায় এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে শুধু বিমানের টিকিট কাটলেই বাংলাদেশিরা সেখানে যেতে পারতেন। কিন্তু এখন সে সুযোগ বন্ধ। অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা তুলে নিয়েছে দেশটি।
কম্বোডিয়ায় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার থাকলেও, বাংলাদেশিদের জন্য কঠিন নিয়মকানুন আর দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া কার্যত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং সেনজেন ভুক্ত দেশগুলোতে ভিসার জন্য আবেদন করলে অনেক সময়ই প্রত্যাখ্যাত হতে হচ্ছে। পূর্বে ভ্রমনকারীদেরও ভিসা দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। বর্তমানে দেশ দুটিতে বাংলাদেশি ভিসা প্রত্যাহারের হার ৭০ শতাংশে উঠে এসেছে বলে একাধিক ভিসা প্রসেসিং সেন্টার নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস ফোরাম (বোটঅফ) জানিয়েছে, গত দেড় বছরে বাংলাদেশ থেকে বহির্গামী পর্যটন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং কর্পোরেট ভ্রমণ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এই পরিস্থিতির জন্য তারা ব্যাপক ভিসা বিধিনিষেধ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন।
বোটঅফ সভাপতি চৌধুরী হাসানুজ্জামান বলেছেন, যদি নির্বাচন পর্যন্ত এ অবস্থা চলে, তাহলে অনেক ছোট ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে অনেকে কোভিডের সময়ের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে আছে।









