ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৭:১৬ পূর্বাহ্ন

দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড

বিপন্ন মানবিকতা ও সংকটে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তা

বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দিন যত যাচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশকে ক্রমাগত অস্থিতিশীল করে তুলছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নৃশংসতা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। এই ঘটনা কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার এক চরম ও নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ।

single-ad-main-1

​দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: ১৮ ডিসেম্বরের সেই অভিশপ্ত রাত

​২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় যে বর্বরতা ঘটেছে, তা মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে (২৭) ধর্মীয় অবমাননার কথিত অভিযোগে একদল উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়; প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, হত্যার পর তার দেহ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

​এই ঘটনায় পুলিশ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করলেও এবং অন্তর্বর্তী সরকার একে “নতুন বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত” বলে অভিহিত করলেও সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—কেন আইনের হাতে সোপর্দ না করে প্রকাশ্য দিবালোকে এক যুবককে এভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হলো? এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ ও ক্ষোভের ঢেউ সৃষ্টি করেছে, যা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

single-ad-main-2

​আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ

​বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের এই ঘটনাগুলো এখন আর অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

​জাতিসংঘ: জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা (OHCHR) বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে।

​অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: সংস্থাটি গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া ২,০০০-এর বেশি সহিংসতার ঘটনা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে যে, “প্রতিহিংসার রাজনীতি” ও “গণপিটুনির সংস্কৃতি” বন্ধ না হলে মানবাধিকারের বড় বিপর্যয় ঘটবে।

​মার্কিন কমিশন (USCIRF): যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে হিন্দুদের ঘরবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে।

​বৈশ্বিক প্রতিবাদ: দিপু দাসের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতের দিল্লি, কলকাতা ও ত্রিপুরায় তীব্র বিক্ষোভ হয়েছে। আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে অনুপ্রবেশ ও যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কারোর জন্যই কাম্য নয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দোষীদের বিচার দাবি করেছে। এছাড়া কানাডার টরন্টো ও অটোয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছেন। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও রাজপথে দিপু হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।

​পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতা

​বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর প্রায় ২,৪০০-এর বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিপু দাসের ঘটনাটি এই পরিস্থিতির একটি চূড়ান্ত রূপ, যা প্রমাণ করে যে একটি গুজব বা অপবাদ ব্যবহার করে সহজেই সংখ্যালঘুদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

​আমাদের করণীয়

​মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সকল ধর্মের মানুষের রক্ত মিশে আছে। তাই বাংলাদেশ কোনো একক ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয়। এই দেশ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কেবল দায়িত্বই নয়, এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:

​১. দ্রুত বিচার: দিপু দাস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. আইনি কঠোরতা: ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। গুজব সৃষ্টিকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. সুরক্ষা আইন ও কমিশন: সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন দ্রুত কার্যকর করা এবং ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন এখন সময়ের দাবি।
৪. সামাজিক সংহতি: প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়িয়ে দাঙ্গা বাঁধাতে না পারে।

​উপসংহার

​দিপু চন্দ্র দাসের নিথর দেহ যখন মহাসড়কে পুড়ে ছাই হচ্ছিল, তখন আসলে আমাদের অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধই ভস্মীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি আজ রুখে না দাঁড়াই এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি না করি, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। দিপু দাসের রক্ত যেন বৃথা না যায়—আসুন আমরা একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিই।

​(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

তথ্যসুত্র :— বিবিসি বাংলা, অ্যামানেষ্টি ইন্টারন্যানাল এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ