ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ন

প্রতিবছর পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপা

নেপথ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য

২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বছরের প্রথম দিনেই মাধ্যমিক স্তরের ৬০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পরিকল্পনা করেছিল অন্তত এক–দুটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার, কিন্তু বাস্তবে অনেক বিদ্যালয়ে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির একটি বইও পৌঁছায়নি।

single-ad-main-1

অন্যদিকে, বছরের শুরুতেই বাজারে ছড়িয়েছে গাইড বই। লেকচার পাবলিকেশন ৮০ শতাংশ নোট-গাইড বাজারে সরবরাহ করে এবং তাদের বই ১ জানুয়ারিতেই সারা দেশে পৌঁছে গেছে। প্রশ্ন উঠছে—পাঠ্যবই বিলি হওয়ার আগেই গাইড বই এলো কীভাবে?

সূত্র জানায়, প্রতি বছর পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপানোর নেপথ্যে রয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ গাইড বই বাণিজ্য। লেকচার পাবলিকেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নতুন পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি, নম্বর বণ্টন ও সিলেবাসের তথ্য আগাম অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করে।

শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা গোপনে এই কোম্পানিতে মাসিক বেতনে চাকরি করেন এবং নোটবই লেখার কাজ করেন। গাইড বই বিক্রি বাড়াতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিশন ও ঘুষ বাবদ এবার ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।

single-ad-main-2

২০০৮ সালে হাইকোর্টের আদেশে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করা হয়। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বই ছাপা ও বিক্রির দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।

তবুও ‘সহায়ক বই’, ‘অনুশীলনমূলক বই’ নামে খোলস পাল্টে অবৈধ গাইড বই প্রকাশ্যে বাজারজাত হচ্ছে। এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই ব্যবসা চলছে অবাধে।

লেকচার প্রকাশনীর সাবেক পরিচালক জানান, প্রতিষ্ঠানটি বছর শুরুর আগেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে। রাজধানীর নামীদামী স্কুলে অর্ধ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়।

তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির অর্থে মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানি ‘নগদ’-এর শেয়ার কেনা এবং ফার্মার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ বাগিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা বেকায়দায় পড়ে, তবে পরে সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করে আবারও অবাধে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

১৫ জন শিক্ষার্থী ও ১০ জন অভিভাবক জানান, ক্লাসে নির্দিষ্ট প্রকাশনার গাইড বই কিনতে বাধ্য করা হয়। এতে পরিবারে বড় আর্থিক চাপ পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, “শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন প্রধান গুরুত্ব পরীক্ষার ওপর। এজন্য নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে শিক্ষার গুণগতমান বাড়ছে না, শিক্ষার্থীদের মেধার প্রকৃত বিকাশ হচ্ছে না।”

২০১০ সাল থেকে পাঠ্যবই বিতরণে বিলম্বের ইতিহাস রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত কোনো বছরই জানুয়ারিতে বই বিতরণ সম্পূর্ণ হয়নি। ২০২৬ সালে আগেভাগে দরপত্র আহ্বান করা হলেও ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে রিটেন্ডার দেওয়ায় তিন মাস দেরি হয়।

নবম শ্রেণির বই ছাপার কার্যাদেশ আড়াই মাস আটকে রাখা হয়, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলেন, “প্রতি বছরই কোনো না কোনো অজুহাতে পাঠ্যবই দেরিতে ছাপানো হয়, যাতে গাইড বই ব্যবসা জমজমাট হয়।”

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি সরকারি বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক জানান, “দেশের প্রতিটি জেলাতেই গাইড বইয়ের বাণিজ্য চলছে। স্থানীয় স্কুলগুলোর অসাধু কিছু শিক্ষক এই ব্যবসার মূল চালিকা শক্তি।” লেকচার পাবলিকেশনের প্রতিনিধিরা শিক্ষকদের হাতে নগদ অর্থ দেন, যাতে তাদের গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া হয়। এর দায়ভার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপরও বর্তায়।

বাংলাদেশে পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপানোর পেছনে যে গাইড বইয়ের বিশাল বাণিজ্য রয়েছে, তা এখন আর গোপন নয়। শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নের বদলে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সাফল্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থে গাইড বইয়ের আধিপত্য বাড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে এই অবৈধ গাইড বই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—তা না হলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথ আরও সংকুচিত হবে।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ