ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৬:২৫ পূর্বাহ্ন

এবার বসুন্ধরার গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি জুলাই আন্দোলনকারীদের

প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের পর এবার বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কথিত জুলাই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) গাজীপুরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা জান্নাত সুরভী নামের এক আন্দোলনকারী এ ধরনের হুমকি দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

single-ad-main-1

সংবাদ সম্মেলনে সুরভী বসুন্ধরা মিডিয়াকে “প্রথম আলোর মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে” বলে মন্তব্য করেন—যা সাংবাদিক মহল ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর আগে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।

তাহরিমা জান্নাত সুরভী সম্প্রতি একটি চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) গাজীপুর সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–২ তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে আদালতের ওই আদেশের পরপরই একদল লোক জেল চত্বরে বিক্ষোভ ও মব তৈরি করে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যায়—যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সুরভীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক দাবি করে তার গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের প্রতিবাদে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন জুলাই আন্দোলনের সমর্থকরা। জেল থেকে বের হওয়ার পরপরই অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনেই তিনি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আগ্রাসী বক্তব্য দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

single-ad-main-2

এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)–এর ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়, বছরজুড়ে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও নিপীড়নের অন্তত ৩৮১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তত ২০ জন সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন এবং ১২৩ জন সাংবাদিক পেশাগত কাজের প্রতিশোধ হিসেবে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার, যা সমালোচনামূলক সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও আটক করতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালে সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না ও আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তার দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আনিস আলমগীর এখনও কারাবন্দী রয়েছেন, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

এ ছাড়া জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স (জেএ) নামের একটি গোষ্ঠীর হুমকির পর তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের অন্তত তিনজন সাংবাদিক চাকরি হারান। অভিযোগ রয়েছে, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে প্রশ্ন করার জেরেই তাদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট সহিংসতা সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত ২০২৫ সালজুড়েই কারাবন্দী ছিলেন। পাশাপাশি শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সাল বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক গভীর সংকটের সময়। স্বাধীন সাংবাদিকতাকে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে না দেখে ক্রমেই একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে হুমকি, মামলা, গ্রেপ্তার ও সরাসরি হামলার ঘটনায়।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন