
২৫ মার্চ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও বিভীষিকাময় রজনী। ১৯৭১ সালের এই কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়েছিল, তা আধুনিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন অধ্যায়। কেবল এক রাতেই ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ১ লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এই রক্তক্ষয়ী স্মৃতিকে অম্লান রাখতে ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সেদিন বিকেল ৫টা ৪৪ মিনিটে আলোচনা ব্যর্থ করে দিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন এবং বাঙালির ওপর মরণ আঘাতের ‘নীল নকশা’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে (জহুরুল হক হল) ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হলের ১০৩ জন ছাত্র এবং কর্মচারী কোয়ার্টারের নারী-শিশুসহ অনেক পরিবারকে নিঃশেষ করা হয়।
ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য ও ড. মনিরুজ্জামানসহ বরেণ্য শিক্ষকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়েন। তবে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের মুখে শহরটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তারের পূর্বেই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১৯৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ ২১ বছর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করলেও ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার উদ্যোগ নেন। ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জোরালো হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট’, ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন ফর সাইটস অব কনসিয়েন্স’ একাত্তরের হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০২২ সাল থেকে মার্কিন কংগ্রেসে রো খান্না ও স্টিভ শ্যাবট কর্তৃক স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক ২০ মার্চ (২০২৬) মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই কর্মকাণ্ডকে সুস্পষ্ট ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তানকে ক্ষমা চাওয়ার এবং জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ চরম হুমকির মুখে। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মারক বিধ্বস্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংকুচিত করা এবং জাতীয় চার নেতার অবদানকে গৌণ করার অপচেষ্টা চলছে। পরাজিত শক্তির দোসররা তরুণ প্রজন্মের আবেগ ব্যবহার করে প্রতিশোধের রাজনীতিতে মেতে উঠেছে। ইউনুস জমানার শেষ হলে ও এখনো শেষ হয়নি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতির।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শের ষড়যন্ত্র রুখতে ২৫ মার্চের গণহত্যার সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে বারবার তুলে ধরতে হবে।
শহীদদের রক্তঋণ শোধ করা এবং একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র পথ হলো—আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই জারি রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃজাগরণ ঘটানো। সত্য ইতিহাস জানলে বর্তমান প্রজন্ম কখনোই পরাজিত শক্তির সহযোগী হবে না।
( লেখক পরিচিতি: মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।)
দেশপক্ষ/ এমএইচ








