
বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের নজির স্থাপন করেছিল। শিশুদের সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে গড়ে ওঠা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে “ভ্যাকসিন হিরো” পুরস্কারে ভূষিত করেছিল আন্তর্জাতিক টিকা জোট Gavi, the Vaccine Alliance।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজধানীর একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত এক মাসে ১৯ শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট নয়; বরং পরিকল্পনা, নজরদারি ও ধারাবাহিকতার ঘাটতির ইঙ্গিতও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ধরে রাখতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থা, নিয়মিত বুস্টার ডোজ, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা—সবকিছুই সমানভাবে কার্যকর থাকতে হয়। এসবের যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় টিকার ঘাটতি, বুস্টার ডোজ কার্যক্রমে অনিয়ম এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকদের একটি অংশের মতে, এসব কারণেই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে টিকা কার্যক্রমে কিছু ঘাটতি ছিল। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, যদি অতীতে টিকা কার্যক্রমে ঘাটতি থেকেও থাকে, তা পূরণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল।
তাদের মতে, টিকাদান কর্মসূচি এমন একটি ব্যবস্থা যা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হয়। কয়েক বছরের অবহেলা বা পরিকল্পনার ঘাটতি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সমালোচকদের মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া মূলত সংকট দেখা দেওয়ার পর এসেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার পর বাজেট বরাদ্দ ও নতুন উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে আগে থেকেই ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল।
স্বাস্থ্যখাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দায়–দায়িত্ব নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। অতীত বা বর্তমান—যে সময়েই ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকুক, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তারা মনে করেন, টিকাদান কর্মসূচি শুধু কোনো সরকারের অর্জন নয়; এটি একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগের ফল। তাই রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, জবাবদিহিতা এবং ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় যে দেশ টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছিল, সেই সাফল্য ধরে রাখতে হলে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
দেশপক্ষ/ এমএইচ








