ঢাকা, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ২:০৭ পূর্বাহ্ন

আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠছে হাম

# হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল
# হাম রোগীকে ১০০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স দেবে গণস্বাস্থ্য
# ২৪০০ হাম রোগীকে আর্থিক সহায়তা দেবে আইএফআরসি
# হামের রোগীদের জন্য ঈদের ছুটি বাতিল দায়িত্বরত ডাক্তার-নার্সদের

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশজুড়ে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠছে হাম ও হামের প্রাদুর্ভাব। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক কেউই রেহাই পাচ্ছেন না প্রাণঘাতি এই রোগ থেকে। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা দিন দিন উপচে পড়ছে এবং প্রতিদিন হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে বহু শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

সর্বশেষ ভয়নক হয়ে ওঠা হাম এবং এর উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট ৫১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২১৩২ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরে হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ সময়ে সারাদেশে আরও ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

হাম বিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে একজন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, তার বাড়ি বরিশালে। বাকি ১২ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকায় চারজন, চট্টগ্রামে দুজন, সিলেটে চারজন, বরিশালে একজন এবং ময়মনসিংহে একজন শিশু রয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৮৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতর আরও বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর। এসময় উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৫ হাজার ১১ জন শিশু।

জানা গেছে, প্রাণঘাতি রোগ হামের প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে শয্যার চেয়ে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে করিডোর ও হাসপাতালের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর মধ্যে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি। আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, ঈদের আগে থেকেই রোগীর চাপ বেড়েছে। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সেখানকার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর বড় অংশই হামে আক্রান্ত। ফলে তাদের মূল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

হাম রোগীকে ১০০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স দেবে গণস্বাস্থ্য: ঢাকা শহরের মধ্যে যেকোনো এলাকায় হামে আক্রান্ত রোগীকে ১০০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেবে ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল। এছাড়াও হাসপাতালটিতে হামরোগীর চিকিৎসায় আইসোলেশন ইউনিট চালু রয়েছে। বৃহস্পতিবার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে হাম রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের হামের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ধানমন্ডিস্থ ‘গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল আইসোলেশন ইউনিট’ চালু আছে। এছাড়াও ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে যেকোনো হামে আক্রান্ত রোগীকে আনা-নেওয়ার জন্য বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স ফি মাত্র ১০০ টাকা। হামের বিস্তার রোধে অসুস্থ শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দিয়েছে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল। অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য যোগাযোগ: হাসপাতাল: ০১৯৫৮২৭৭৮০০, আল-আমিন (অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার): ০১৩১৭৮৩৪৭৫৬।

২৪০০ হাম রোগীকে আর্থিক সহায়তা দেবে আইএফআরসি: হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৪০০ রোগীকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ১০ হাজার করে টাকা দেবে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)।শনিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, সারাদেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের আর্থিক সহযোগিতা করবে প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতাল পরিচালকদের মাধ্যমে আর্থিকভাবে দুর্বল রোগীদেরকে এসব অনুদান দেওয়া হবে। মোট ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা হাম রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তার জন্য দেওয়া হবে। অনেক রোগী রয়েছেন আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং ঠিকভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে। তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, আইএফআরসি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হামের রোগীদের জন্য ঈদের ছুটি বাতিল দায়িত্বরত ডাক্তার-নার্সদের: হামের রোগী ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের ঈদে ছুটি হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

শনিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।যেসব হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে, সে হাসপাতালে ঈদের ছুটির মধ্যে চিকিৎসকরা থাকবেন কি না, নাকি ছুটিতে চলে যাবেন- এ প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, থাকবেন ইনশাল্লাহ। আমরা অলরেডি সার্কুলার দিয়েছি। ধন্যবাদ আপনাকে এটা বলাতে, এটাও আপনারা আশ্বস্ত হতে পারেন, আমরা সতর্ক করছি। হামের রোগী এবং জরুরি স্বাস্থ্য সেবাতে কোনো ডাক্তারের, নার্সের ছুটি হবে না। থাকতে হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটা কথা আপনাদেরকে বলি। ভ্যাকসিন নিলেই যে ১০০ পার্সেন্ট একটা বাচ্চা হাম হবেই না, এটা কিন্তু বলা যায় না। স্মল পক্স ইজ ফুল্লি ইরাডিকেটেড, কলেরা ইজ ইরাডিকেটেড, এখন কিন্তু কলেরা হচ্ছে। আপনার যদি রেসিস্ট্যান্স মাত্রাটা কেউ ক্রস করে যান, পচা-তিতা খাবার খেয়ে যান, তাহলে তো কলেরা হবে। ঠিক একই জিনিস কিন্তু এটাও।

তিনি আরও বলেন, যদি বেশিভাবে ভাইরাসটা ছড়িয়ে যায়, ক্ষেত্র বিশেষে হতেও পারে। এটা কতটুকু গ্যারান্টি আমি জানি না, আই অ্যাম নট এ সায়েন্টিস্ট, যার কারণে আমি জানি না। ঈদের সময় মায়েরা যেন আক্রান্ত শিশুদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নিয়ে না যায় সে অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাচ্চাগুলো যেন অনেক ভিড় আছে এমন জায়গায়ও নিয়ে না যায়। তিনি বলেন, কারণ এটা হাইলি ছোঁয়াচে রোগ। এটা তো সংস্পর্শে গেলেই, শ্বাস-প্রশ্বাসে, দৈনিক মানে সংস্পর্শ লাগলে এটা ছড়ায়। কাজেই এটা থেকেও সবার চেষ্টা করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা প্রেডিক্ট করছেন যে, ফ্রি মিক্সিংয়ের ফলে এই ঈদে বাস যাত্রা, ট্রেন যাত্রা, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, এভাবে যদি হাম রোগীর সংস্পর্শে ভালো মানুষগুলো আসে, সুস্থ বাচ্চারা, তাহলে দেয়ার ইজ এ পসিবিলিটি, একটা সম্ভাবনা থাকবে আরেকটু বেড়ে যাওয়ার।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ