পৃথিবীর এক প্রান্তে বাংলাদেশ। আর অন্য প্রান্তে কানাডার মন্ট্রিয়ল। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এই নগরীতেও দাঁড়িয়ে আছে একটি শহীদ মিনার নীরবে, গর্ব, মাথা উঁচু করে। যেন লাল-সবুজের বাংলাদেশেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি। মন্ট্রিয়ল শহরের বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনারটি কেবলই কংক্রিটের কোনো স্থাপত্য নয়; এটি সুদূর প্রবাসে লালন করা প্রতিটি বাঙালির আবেগ, অশ্রু আর অতলান্তিক গর্বের এক জীবন্ত প্রতীক। এই শহীদ মিনার প্রমাণ করে বাঙালি যেখানে যায়, বাংলা ভাষা আর একুশের চেতনাকেও সঙ্গে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশ হতে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে শহীদ মিনার। ছবি- আসাদুজ্জামান আজম
সবুজ ঘাসের বুকে সাদা স্তম্ভ আর পেছনের রক্তিম বৃত্ত দেখে মনে পড়ে যায় ১৯৫২ সালের সেই ফেব্রুয়ারির কথা। যখন মাতৃভাষা বাংলার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা। সেই আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই দাঁড়িয়ে আছে শহীদ মিনার, বহন করছে বাঙালির আত্মপরিচয়, সাহস আর অস্তিত্বের প্রতীক।
ফেব্রুয়ারির তীব্র শীত আর বরফে ঢাকা মন্ট্রিয়লের মাটিতে যখন এই শহীদ মিনারের বেদিতে আলপনা আঁকা হয়, তখন মনে হয় দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে এ যেন আরেক টুকরো বাংলাদেশ।
হয়তো ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মতো বিশাল নয় এটি। তবুও এর আবেগ কোনো অংশে কম নয়। কারণ এই মিনারের প্রতিটি স্তম্ভ যেন বলে “বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের আত্মা।”
তীব্র শীত আর ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝেও একুশে ফেব্রুয়ারি এলে এখানে জড়ো হন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ”আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…”। তুষারপাত ভেদ করে যখন এই গানটি মন্ট্রিয়লের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন উপস্থিত প্রতিটি বাঙালির চোখে জল আর বুকে গর্বের ঢেউ খেলে যায়। নতুন প্রজন্মের প্রবাসী সন্তানরা, যারা হয়তো বাংলাদেশের মাটিতে বড় হয়নি, তারাও এই শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শেখে তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বের ইতিহাস। তারা জানতে পারে, এই পৃথিবীর বুকে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল।
লেখক অচিন শহরের পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়ান। সবুজ ঘাসের মধ্যে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব আর বীরত্বের শহীদ মিনার। পৃথিবীর আরেব প্রান্তে এমন কর্ম দেখে বুকটা গর্বে ভরে উঠে। জানার কৌতূহল হয়- কিভাবে এখানে শহীদ মিনার তৈরি হলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়- কানাডার মন্ট্রিয়লে নির্মিত বাঙালি জাতি সত্তার এ প্রতীকটি তৈরির পথ মৃসন নয়। কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষা আর চেস্টার ফসল এটি। ৯০ দশক থেকে মন্ট্রিয়লে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে একটি শহীদ মিনার তৈরির চেস্টা চলছিল। তৎকালীন সময়ে ইনডোরে অমর একুশে ফ্রেবুয়ারি পালন করা হতো। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব মন্ট্রিয়ল এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মন্ট্রিয়লের উদ্যোগে বার বার চেস্টা করেও সফল হননি। কমিউনিটির সিনিয়রদের উদ্যোগে অনুপ্রানিত হয়ে এগিয়ে আসেন রোমান আলম নামে এক বাংলাদেশি তরুন। তিনি তরুণ-তরুণীদের একটি অনন্য সামাজিক সংগঠনর Maison des jeunes L’Escampette ( মেজো দে জেন লেসক্যাম্পেত) নামে একটি যুব সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। সংগঠনটির হয়ে ( City of Montreal ) সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। তার উদ্যোগে সিটি প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ২০২২ সালে শহীদ মিনারটির গোড়াপত্তন করেন। এরপর হতে মন্ট্রিয়লে বসবাসরত বাংলাদেশিদেও প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে শহীদ মিনারটি। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাড়াও যে কোন দেশমাতৃকার নানা অনুষ্ঠানে জড়ো হন। শহীদ মিনারটি শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র নটর ডেম ওয়েস্ট- বুলেভার্ড জর্জবেনিয়ার রোডের পাশে অবস্থিত। বর্তমানে শহীদ মিনারটি স্থানীয় শহীদ সালাম বরকত বাংলা স্কুলের তত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশি তরুন রোমান আলম জানান, শহীদ মিনার বাঙালি গৌরবের প্রতীক। আমি সিটি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার সুবাধে মেজো দে জেন লেসক্যাম্পেত সংগঠনটির উদ্যোগে এটি করতে পেরেছি। শহীদ মিনারটিকে স্থায়ী কাঠামো দেয়ার চেস্টা করছি। একজন বাংলাদেশি হিসেবে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেওে গর্ববোধ করি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশি কমিউটিনর সিনিয়র সদস্য, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাকী বিল্লাহ বকুল বলেন, বাঙালির বীরত্বেও প্রতীক শহীদ মিনারটি বাংলাদেশির সব ধরণের আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, বাঙালি সংস্কৃতির নানা আয়োজনে আমরা এখানে জড়ো হই। সদূর কানাডায় শহীদ মিনারটি বাঙালির বীরত্ব তুলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন হাজারো ভিনদেশি আমাদের ভাষা আন্দোলনকে জানার সুযোগ পাচ্ছে। তারা জানতে পারেন-পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি- মায়ের ভাষার জন্য বুক্তের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলাম। আমরা রোমান আলমের প্রতি কৃতজ্ঞ।
তিনি জানান, ৯০ দশকের শেষ দিকে যখন এটি নির্মানের চেস্টা হচ্ছিল, তখন কিছু স্বাধীনতা বিরোধী বাঁধা দিয়ে আসছিল। কিন্তু তারা সফল হননি।
গভীর এক অনুভূতির বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল নকশাকার হামিদুর রহমান জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছিলেন মন্টিয়ালেই। তাই এই শহরে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার যেন ইতিহাস আর আবেগের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।









