ঢাকা, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

শরীয়তপুরে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি ভুক্তভোগীদের

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত সীমানা ও শর্ত না মেনে শত শত ড্রেজার, কাটার মেশিন বসিয়ে দিন রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সামনের বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের চরম আতঙ্কে রয়েছেন চরঅঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর নড়িয়া উপজেলার চরাত্রা চরের বালুর স্তূপ থেকে ১০ কোটি ঘনফুট বালু নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে উপজেলা প্রশাসন। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ০.৪৯ টাকা হিসেবে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকায় কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফরিদ উদ্দিন রয়েল মাঝি। তবে রযেল মাঝির ইনভেস্টর হলেন সখিপুর থানার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ঢাকায় অবস্থানরত পেশাদার সুদের ব্যবসায়ী এবং শেয়ার মার্কেটের জুয়াড়ি ফরিদ আহমেদ মাল।

নিলামের শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র স্তূপ থাকা বালু অপসারণের অনুমতি থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, স্তূপের বালুর পরিবর্তে পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর গভীরতা ও পানির ধারণক্ষমতা আকস্মিকভাবে বেড়ে গিয়ে পানির তীব্র স্রোত সরাসরি নদীতীরে আঘাত হানছে। ফলে নদীর তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি ও বসতভিটা ভাঙনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে নৌপথে ঘুরে দেখা যায়, নড়িয়া উপজেলার চারাত্রায় বালুর স্তূপের নিচে ও স্তূপের আগ থেকেই প্রায় প্রায় ৫০-৬০ টি কাটার ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ এক যুগ ধরে পদ্মার ভয়াল ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে আসছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার তীরবর্তী জনপদ। বিশেষ করে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ের ভয়াবহ নদীভাঙনে নড়িয়ায় প্রায় ৩০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি বেসরকারি নানা স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। নদীভাঙনের হাত থেকে নড়িয়া-জাজিরার মানুষকে রক্ষা করতে ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) “নড়িয়া-জাজিরা পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প” বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পের আওতায় জাজিরার শফিকাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীপথে চর খননের কাজও করা হয়। পাশাপাশি নির্মিত বাঁধ আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে নড়িয়ার সুরেশ্বর থেকে মুলফৎগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় নদীতে ফেলা হয়েছে ১১ লাখ বালুভর্তি জিও ব্যাগ। এ কাজে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক বলেন, নদীর ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এভাবে বালু কাটতে থাকলে আমরা আর এখানে টিকে থাকতে পারব না। ফসলি জমিতে ধান চাষ করা যাবে না, কৃষিকাজও হুমকির মুখে পড়বে। বালুর স্তুপ অপসারণের নামে তারা আসলে নদীর তলদেশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি। এর জন্য দায়ী বিএনপি নেতা রয়েল মাঝি এবং সুদের ব্যবসায়ী ও জুয়াড়ি ফরিদ মাল। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানাই এবং এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ফরিদ উদ্দিন রয়েল মাঝি বলেন, আমরা নিলামের মাধ্যমে কাজটি পেয়েছি এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করছি। মাঝখানে প্রায় সাত মাস কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে নিয়ম মেনেই বালুর স্তূপ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

আর ফরিদ আহমেদ মাল বলেন, আমি বালু উত্তোলনের জন্য কাউকে কোনো টাকা দেইনি। এসব অপপ্রচার, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, বালু উত্তোলনের কাজের তদারকির জন্য উপজেলা তিনটি দপ্তর নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে আমাদের রিপোর্ট দিবে। নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের বিষয় আমরা খতিয়ে দেখবো। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাপন গ্রহন করবো।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ