ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন

বাঙালির প্রতিটি অর্জনের ইতিহাসে মিশে আছে আওয়ামী লীগ

 

আসাদুজ্জামান আজম

​২৩ জুন ২০২৬। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন।  ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে জন্ম নেওয়া সংগঠনটি ৭৭ বছরে পদার্পণ করল। এরপর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহীরুহের নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটি কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির জাতীয় মুক্তি, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাঙালি জাতির প্রতিটি অর্জনের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় মিশে আছে আওয়ামী লীগের নাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার অবিচ্ছেদ্য। দলটির ৭৭ বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ভূমিকা কেবল নেতৃত্বদান নয়, বরং একটি জাতিকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের ইতিহাস কল্পনা করা অসম্ভব। ১৯৪৯ সালে দলটির জন্মের পর থেকেই তিনি এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এমন এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা বাঙালির পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালির প্রতিটি সংকটে ও সংগ্রামে আওয়ামী লীগ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এই রাজনৈতিক দলটি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল। তবে কোনো নিষেধাজ্ঞা দলটিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং দ্বিগুন শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে।

জন্মলগ্ন প্রেক্ষাপট: একটি নতুন যাত্রার শুরু

​বিশ শতকের চারের দশকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত উত্তাল। দেশভাগের পরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে। শোষক শ্রেণির বৈষম্যমূলক আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এই পটভূমিতেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে জন্ম নেয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। তৎকালীন সময়ে কারান্তরীন থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্মসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা:

বঙ্গবন্ধু কেবল দলের কর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ১৯৫৩ সালে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সারা বাংলায় দলের ভিত্তি মজবুত করেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনমত গড়ে তোলেন।  ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নাম রাখা ছিল বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন, যা বাঙালির অখণ্ড জাতিসত্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার স্থপতি :

​১৯৪৯ সালে দলটির জন্মের পর থেকেই তিনি এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। ​আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিল বাঙালির মুক্তি। সেই লক্ষ্য অর্জনে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সবশেষে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে তিনি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন।  মূলত  বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির মুক্তির এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিসাংবাদিত নেতা ।  ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। এর ভিত্তিতেই তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেন।

​১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ও দলীয় কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। একটি রাজনৈতিক দলের হাত ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের এমন নজির বিশ্বে বিরল। মোট কথা আওয়ামী লীগের হাত ধরে বাঙালি স্বাধীন একটি ভূ-খন্ড পেয়েছিল।

গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অগ্রযাত্রা

​স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আওয়ামী লীগকে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর দলটিকে নিশ্চিহ্ন করার বহুমুখী ষড়যন্ত্র চালানো হয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর সামরিক ও স্বৈরশাসনের বেড়াজালে অবরুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ রাজপথে অকুতোভয় সৈনিকের মতো লড়েছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দলটি পুনরায় জনগণের ম্যান্ডেট অর্জন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করে।

​পরবর্তী বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ বারবার জনগণের রায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গত দেড় দশকের অবদান অনস্বীকার্য। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, গোটা দেশ বিদ্যুতায়ণ, দারিদ্র্য হ্রাস, সহ নানা  মেগা প্রকল্প প্রমাণ করে আওয়ামী লীগের উন্নয়নের দর্শন কতটুকু সুদূরপ্রসারী।

সাফল্যের মূলমন্ত্র: তৃণমূলের শক্তি

​আওয়ামী লীগের শক্তি কোনো রাজপ্রাসাদে নয়, এর শক্তি তৃণমূলের কর্মীদের মাঝে। দলটি আজও দেশের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে টিকে আছে কারণ এর সাংগঠনিক ভিত্তি গ্রাম-গঞ্জ থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত। বিপদে-আপদে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা সংকটে আওয়ামী লীগ সবসময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনার সময় বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে মানবিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা জনগণের আস্থার জায়গাটিকে আরও মজবুত করেছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্ব :

১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ২১ বছর ধরে সামরিক ও আধা-সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।  তাঁর প্রত্যাবর্তন দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। তিনি ২০০৮ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে তিনি বাংলাদেশকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং বর্তমানে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন।  মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিনি সক্ষমতার এক নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছেন।

 সংগ্রাম ত্যাগের পরম্পরা

​বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রায় ১৪ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন জনগণের মুক্তির জন্য। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯ বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। ​বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন, ‘জনগণই আমার শক্তি’। শেখ হাসিনাও ঠিক সেই পথেই চলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের সময় তিনি সর্বদা সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেন।

নিষেধাজ্ঞা, সংকট ও মোকাবেলা  ও ঘুরে দাঁড়ানো :

বাংলাদেশের  স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলটি প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরোনোর আগেই সংকটের মধ্যে পড়েন। , ‘দ্য আওয়ামী লীগ, সেভেন্টি ইয়ার্স আফটার ১৯৪৯’ শীর্ষকি একটি  নিবন্ধে দলটির ওপর ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের খড়গ তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। পরে ২৭শে অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পুরোপুরি সেনা শাসনের মাধ্যমে দেশ চালাতে শুরু করেন।

সে সময় সামরিক আইনের অধীনে একটি অধ্যাদেশ (Political Parties Elected Bodies Disqualified Ordinance -PRODO) জারি করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন আইয়ুব খান, যার আওতায় আওয়ামী লীগও পড়ে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তাদের আটক ও নজারদারির মধ্যে রাখা হয়। পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডন-এ প্রকাশিত, ‘ফ্রম মার্শাল ল টু ডেমোক্রেসি: পাকিস্তান লং হিস্ট্রি অফ ব্যানিং পলিটিকাল পার্টিস’ নিবন্ধে ও এই নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ৭১ সালের ২৬ শে মার্চ, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে আওয়ামী লীগকে “রাষ্ট্রদ্রোহী” ঘোষণা করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। ইয়াহিয়া খান বলেন, “আওয়ামী লীগ একটি রাষ্ট্রদ্রোহী দল এবং এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।”

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, যার ফলে দলটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। একই বছরের নভেম্বরে সেনা সমর্থিত খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়। তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সে সময় দলটির অনেক নেতা গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দি হন। যার কারণে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে যায় আওয়ামী লীগ। লরেন্স লিফটশুলজের, ‘বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন’ বইয়ে উল্লেখ আছে, সামরিক সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করলেও তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো এবং তাদের নেতাদের ওপর নজরদারি করা হতো।

এরপর ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ সরকার আওয়ামী লীগকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও, দলটি নানা ধরনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, নিষেধাজ্ঞা ও দমনমূলক পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়।

গ্লোবাল ননভায়োলেন্ট অ্যাকশন ডাটাবেসে প্রকাশিত, ‘বাংলাদেশ ব্রিং ডাউন এরশাদ রেজিম, ১৯৮৭-১৯৯০’ নিবন্ধে এরশাদের আমলে আওয়ামী লীগের অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে জানা যায়, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন।

এসময় সংবিধান স্থগিত করে এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ এবং এর সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক সহিংসতা চালানো হয়।

নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ের পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা শুরু হয়।

সেসময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করে উদ্বেগ জানায়।

এক-এগারো খ্যাত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে  চরম সংকটে পড়ে দলটি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘বাংলাদেশ: ইভেন্টস অফ ২০০৭’ প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে, ২০০৭–২০০৮ সালে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরাসরি নিষিদ্ধ না হলেও, দলটি দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার, এবং দলীয় কার্যক্রমে বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একাধিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত করা হয় । “মাইনাস টু” নীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দলটির তৃনমূল নেতাদের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাইরে যেতে শক্ত অবস্থানের কারণে সেটা সফল হয়নি।

২০২৪ সালের গণ আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দলটির বেশিরভাগ শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন, পলাতক অথবা কারাগারে রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যা, দুর্নীতির একাধিক মামলা রয়েছে। ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলনে ‘গণহত্যা’র অভিযোগে  শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাদের  বিচার চেস্টা চলছে। যদিও সে বিচার কার‌্যক্রম নিয়ে দেশ বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বছর ১০ মে বির্তকিত পন্থায় ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপদেষ্টা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের কার্যক্রম (সাইবার স্পেসসহ) নিষিদ্ধ থাকবে।

ড. ইউনূসের পদাক্ষ অনুসরণ করে বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার চলতি বছর ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ও আইনগতভাবে স্থগিত করেছে। বিলটি পাসের ফলে দলটির সব ধরনের সমাবেশ, অনলাইন প্রচারণা ও প্রেস বিবৃতি প্রদান নিষিদ্ধ থাকে

কিন্তু ইতিহাস বার বার ফিরে আসে। আওয়ামী লীগ তাদের ইতিহাসে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা ও সংকটে পড়েও রাজনীতির মূলধারায় ফিরে এসেছে।

 

সংকট মোকাবিলায় আপসহীন: দলের কঠিনতম সময়ে (যেমন: ১৯৭৫-পরবর্তী সময় বা ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়) শেখ হাসিনা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পরও দলটির তৃনমূল নেতারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল রয়েছে। ৫ আগষ্টের পর দলটির প্রথম সারির কোনো নেতাই দেশে নেই। কেউ বিদেশে বা কেউ কারাগারে। দলটির সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) এবং শীর্ষ নেতা-কর্মীসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী হত্যা, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর থেকে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, জনরোষ ও বিভিন্ন সংঘর্ষের জেরে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে দল টির নেতাকমীরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন।

এমন সংকটেও সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে একটা কাগুজে সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। মিছিল ও প্রতিবাদ বন্ধে সরকার সারাদেশে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু গণগ্রেফতার, মব সন্ত্রাস, পুলিশের লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে সারাদেশে দলটির তৃনমূল নেতাকর্মী প্রতিবাদ, মিছিল অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবাষিকী ঘিরে সারাদেশ যে মিছিল অব্যাহত রয়েছে। এতে আবারো প্রমান করে- আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের গণমানুষের দল। দলটিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আটকে রাখা যাবে না। বরং অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে দলটি শক্তিশালী হয়ে ফেরার পথ খুলছে।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন