ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩:০৬ পূর্বাহ্ন

কারাবন্দি গণতন্ত্র ও শেখ হাসিনার সেই ঐতিহাসিক চিঠি: ফিরে দেখা ১৬ জুলাই

বাঙালি জাতির অদম্য চেতনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে যে অন্ধকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনাকে কারাগারে বন্দি করে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করার নীল-নকশা তৈরি করেছিল ১/১১-এর কুশীলবরা। ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেদিন ধানমন্ডির সুধাসদন থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল। ইতিহাসে এই কালো দিনটি ‘গণতন্ত্র অবরুদ্ধ দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

​২০০৭ সালের ১৬ জুলাইয়ের কারাবরণ যেমন ছিল গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যার একটি ঘৃণ্য প্রচেষ্টা, ঠিক তেমনি ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ১/১১-এর সময় যেমন ‘মাইনাস শেখ হাসিনা’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা হয়েছিল, আজও তেমনি একটি মহল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সমূলে উৎপাটন করতে মরিয়া। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, সত্য ও ন্যায়ের জয় অবধারিত।

​গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখে গিয়েছিলেন। সেই চিঠির প্রতিটি শব্দ ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অকুতোভয় শপথনামা, যা সেদিন কোটি মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল। চিঠিটি ছিল এরকম: “প্রিয় দেশবাসী, আমার সালাম নিবেন। আমাকে সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায় জানি না। আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারাজীবন সংগ্রাম করেছি। জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। তারপরও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। উপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও আপনারা দেশবাসী, আপনাদের ওপর আমার ভরসা।

আমার প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে আবেদন—কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব। আমার ভাগ্যে যাহাই ঘটুক না কেন, আপনারা বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। জয় জনগণের হবেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়বই। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবোই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।” (শেখ হাসিনা, ১৬.০৭.২০০৭)

​সে সময় কারাবন্দি থাকাকালীন তাকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে তিনি বীরদর্পে দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছিলেন।

​বর্তমান পরিস্থিতিও চ্যালেঞ্জিং। দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, তা সমগ্র জাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই সংকটকালে শেখ হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। ১/১১-এর সময়কার ষড়যন্ত্রকারীরা আজও বিভিন্ন কৌশলে সক্রিয়। তারা চায় দেশ যেন আর কখনোই স্থিতিশীল না হয়।

​এই লড়াইয়ে সফল হতে হলে আমাদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলের প্রতিটি স্তরে ইস্পাতকঠিন ঐক্য বজায় রাখতে হবে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাইয়ের সেই চিঠিতে তিনি যে অকৃত্রিম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—”আমি আছি আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব”—সেটিই আজ আমাদের মূল শক্তি। সেই আস্থার প্রতিদান দিতে এবং ৫ ও ১৫ আগস্ট বা ১৬ জুলাইয়ের মতো কালো অধ্যায় যেন আর ফিরে না আসে, সেজন্য প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে আজ সতর্ক থাকতে হবে। শেখ হাসিনার ফিরে আসার এই ঘোষণা নতুন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ভোর নিয়ে আসবে—এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশাই করি।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ