ঢাকা, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ৫:০৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছিল, তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আজও বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কার্যত পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, সাজাপ্রাপ্ত বন্দি পালানো এবং অভিযুক্ত জঙ্গিদের পলায়নের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায় এবং পেছনের সংগঠিত শক্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের বিষয়ে আজও কোন উদ্যোগ চোখে পড়লো না!

তথ্য বলছে, বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক প্রচারণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ২,০০০-এর বেশি বন্দি পালিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০ জন জঙ্গি ছিল। একই সময়ে ৫ই আগস্টের পর অন্তত ৪৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছিল।

ডিসেম্বর ২০২৪-এর কারা বিভাগের তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আনে। তখনও ৭০০-এর বেশি পলাতক বন্দি ধরা পড়েনি; তাঁদের মধ্যে জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিল। ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২,২০০-এর বেশি বন্দি পালানোর কথা জানানো হয়েছিল।

কাছাকাছি সময়ের একটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৬ই আগস্ট ২০২৪ কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বিদ্রোহের পর ২০৯ বন্দি পালিয়ে যায়। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে জঙ্গিও ছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান চালাতে হয়।

অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—এত বিপুল সংখ্যক বন্দি কীভাবে পালাল? কারাগারের নিরাপত্তা কেন এমনভাবে ভেঙে পড়ল? কারা হামলা সংগঠিত করেছিল? কারা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পলাতক জঙ্গি ও শীর্ষ অপরাধীদের কতজন পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়েছে?

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত পুলিশের বিশেষায়িত অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের তথ্যও উদ্বেগের কারণ। তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের অন্তত ৩১১ সদস্য তখনও পলাতক ছিল। এর মধ্যে ১৮৫ জন JMB, ৮৩ জন Ansar Al Islam, ১৬ জন HuJI-B এবং ১৬ জন Neo-JMB-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জঙ্গিবাদ-সংক্রান্ত মামলায় সাজাপ্রাপ্ত নয়জন বন্দি পালানোর ঘটনাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তাহলে যারা একসময় দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অনেক ঘটনাই নাকি রাজনৈতিকভাবে ‘সাজানো নাটক’—তাঁদের কাছে স্বাভাবিক প্রশ্ন: এখনও যদি শত শত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য পলাতক থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
এখানে অবশ্যই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার—কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশের অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এত বড় ফাঁক তৈরি হলে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার জনগণের অবশ্যই আছে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটি শুধু অতীতের অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে নয়; বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ ও পলাতক আসামিদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা এবং পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়মিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতায় থাকা কোনো দলই যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপের আড়ালে চাপা দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রই।

আর ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা’ প্রসঙ্গে আবেগ নয়, তথ্য প্রয়োজন। মার্কিন সরকারের Rewards for Justice কর্মসূচিতে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত যে সর্বোচ্চ ৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার রয়েছে, সেটি অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড এবং রাফিদা বন্যা আহমেদের ওপর হামলার তথ্যের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে; কোনো নির্দিষ্ট বাংলাদেশি জঙ্গি নেতাকে মুক্তি দিলে যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে—এমন তথ্য ওই সরকারি ঘোষণায় নেই।

সুতরাং ‘জঙ্গিবাদের সাজানো নাটক ’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু এর পেছনে সত্যিই কোনো পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল কি না—সেটি প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন নথি, তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ।

তবে প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভাঙল কেন?
শত শত জঙ্গি ও অপরাধী কীভাবে পলাতক হলো?
কাদের ব্যর্থতায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল?
২০২৬ সালেও যদি শত শত জঙ্গি পলাতক থাকে, তাদের ধরতে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী?
আর বর্তমান বিএনপি সরকার কি অতীতের সেই নিরাপত্তা-ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে নয়—তথ্য ও তদন্তেই পাওয়া যাবে।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো অনেক সময় শুরু হয় বড় কোনো বিস্ফোরণ দিয়ে নয়; শুরু হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ছোট ছোট দুর্বলতা, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহির অভাব দিয়ে।

তাই আতঙ্ক নয়—প্রশ্ন করুন। অভিযোগ নয়—প্রমাণ চান। আর যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলুন।

মো. কাইফ ইসলাম: লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ