ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২:০৭ অপরাহ্ন

হৃদয়পটে আঁকা অবিনশ্বর ছবি

দৃশ্যমান ছবি হয়তো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু যে মানুষটি একটি স্বাধীন মানচিত্র ও পতাকার জন্ম দিয়েছেন, তাঁর আসল প্রতিকৃতি খোদাই করা আছে এই দেশের মাটিতে, বাতাসে আর মানুষের চেতনায়। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে, পিতা-মাতার কোলে যেখানে বঙ্গবন্ধু চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন, সেই সমাধিস্থলটি যেন এক পবিত্র স্মৃতির মিনার। সেখানে তাঁর ছবি কিংবা সমাধি দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় এক মহাকাব্যিক ত্যাগের ইতিহাস।

তবে দেয়ালের ফ্রেমে কিংবা কাগুজে ছবিতে তাঁকে বেঁধে রাখা অসম্ভব। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশের প্রতিটি ধূলিকণায়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি সবুজ প্রান্তর আর মুক্ত বাতাসে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি মিশে আছে। ছবি হয়তো সময়ের আবর্তনে বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কোথাও দৃশ্যমান থাকে, আবার কোথাও আড়াল হয়; কিন্তু বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে মুছে ফেলা যায় না।

বঙ্গবন্ধু কোনো দেয়ালে ঝোলানো ছবি নন, তিনি একটি আদর্শ, একটি অনুপ্রেরণা এবং আমাদের জাতীয়তাবোধের ভিত্তি। তাই টুঙ্গিপাড়ার সীমানা পেরিয়ে তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে, প্রগতির মিছিলে এবং লাল-সবুজের পতাকায়। দৃশ্যমান ছবির চেয়েও তাঁর এই অদৃশ্য ও চিরন্তন উপস্থিতি অনেক বেশি শক্তিশালী।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মারক ও ছবি টুঙ্গিপাড়ার সমাধিস্থলের বাইরে রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের কারণে সীমিত হলেও, সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁর ঐতিহাসিক রূপান্তর আরও গভীর ও বাস্তবসম্মত।

একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ক্ষমতার সমীকরণ প্রায়শই জাতীয় প্রতীক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের দৃশ্যমান উপস্থিতিকে প্রভাবিত করে। বাস্তবতার নিরিখে দেখলে, কোনো কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি কিংবা স্মারকের দৃশ্যমানতা সীমিত বা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে (যেমন তাঁর জন্ম ও সমাধিস্থল টুঙ্গিপাড়ায়) সংকুচিত হয়ে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো এবং সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতায় এই দৃশ্যমানতার অনুপস্থিতি কোনো ব্যক্তিত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না।

বাস্তবতা হলো, দেয়াল বা কাগজের ছবি সাময়িক রাজনৈতিক আবহে আড়াল হতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্ম-ইতিহাস কখনো একক কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বা টুঙ্গিপাড়ার সমাধিতে বন্দী থাকে না। বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল স্তম্ভ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক অবস্থান একটি অকাট্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দেশের সর্বত্র দৃশ্যমান না হলেও, তিনি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বে মিশে আছেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর সমাধিস্থলটি যেমন তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে আছে, তেমনি তাঁর আদর্শ ও ত্যাগ কোটি মানুষের অন্তরে আজও চিরভাস্বর।

মো. কাইফ ইসলাম (রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ