ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:০০ পূর্বাহ্ন

​বিশ্বমঞ্চে স্বদেশের সুর: জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রথম বাংলা ভাষণ এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

​ইতিহাস কিছু মুহূর্ত কালকে জয় করে অমর হয়ে থাকে। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তেমনি এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে সেদিন যখন বিশ্বমঞ্চের রোস্টার ডাইাসে গিয়ে দাঁড়ালেন সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নবীন রাষ্ট্রের প্রধান—তখন সমগ্র বিশ্ব এক অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলো। তিনি কোনো প্রথাগত কূটনৈতিক ভাষায় নয়, বরং বিশ্ববাসীর সামনে সগৌরবে উচ্চারণ করলেন তাঁর মাতৃভাষা—বাংলা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

​যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বমঞ্চের শিখরে পৌঁছানোর পথটি মোটেও সহজ ছিল না। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার তখন মাত্র চার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশটির অর্থনীতি তখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত এবং পুনর্বাসনের এক বিশাল চ্যালেঞ্জ সামনে উপস্থিত। এমন এক ভঙ্গুর ও কঠিন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের জোরালো অবস্থান তুলে ধরা ছিল জরুরি। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সর্বসম্মত অনুমোদন ও উদাত্ত আহ্বানে বাংলাদেশ এই বিশ্ব সংস্থার ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ করে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন পরাশক্তি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর নানা গড়িমসি, কূটচাল এবং শীতল যুদ্ধকালীন রাজনীতি এক গভীর সংকটের তৈরি করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জারের মতো প্রভাবশালী কূটনীতিকদের বৈরিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের ভুল ধারণা ও কূটনৈতিক দূরত্ব বাংলাদেশের পথকে করেছিল কণ্টকাকীর্ণ। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ তখন সরাসরি অনুকূলে ছিল না; বরং অনেকটাই ছিল প্রতিকূল।

​এমন এক জটিল ও বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু কোনো ধরনের দ্বিধা বা ঔপনিবেশিক প্রথার তোয়াক্কা করেননি। তিনি বিশ্বমঞ্চের দপ্তরে ইংরেজি বা অন্য কোনো প্রচলিত ভাষার পরিবর্তে বেছে নিলেন নিজের মায়ের ভাষা—বাংলাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কেবল নিজের ভাষায় কথা বলার সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাঙালি জাতির কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি অবিচল আস্থার এক অভাবনীয় সাহসী বহিঃপ্রকাশ। একটি ক্ষুদ্র ও সদ্য স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি মাতৃভাষাকে বিশ্বসভার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

​রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, জাতিসংঘে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।

​প্রথমত: এর মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। বিশ্বকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, এটি এমন একটি জাতি যারা নিজেদের ভাষা, সত্তা ও ভবিষ্যতে পূর্ণ আস্থাশীল। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব রাষ্ট্র তখন নানা বিভ্রান্তি বা বিরোধিতায় লিপ্ত ছিল, তারাও বুঝতে বাধ্য হয় যে এই জাতি মাথা নোয়াবার নয়।

​দ্বিতীয়ত: বঙ্গবন্ধুর এই সাহসী পদক্ষেপ বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি জানান দিতে উন্মুখ ছোট ও নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মনে গভীর আশার সঞ্চার করে। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল—একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যদি বিশ্বসভায় এমন আত্মমর্যাদার পরিচয় দিতে পারে, তবে অন্যরাও তা পারবে।
​তৃতীয় ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি: ছিল অধিকারবঞ্চিত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। বঙ্গবন্ধু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ছোট রাষ্ট্রগুলো যদি নিজেরা আত্মমর্যাদা ও আত্মাধিকার নিয়ে সোজা হয়ে না দাঁড়ায়, তবে কোনো পরাশক্তি বা বৃহৎ রাষ্ট্রের করুণায় তাদের মুক্তি মিলবে না।

​বঙ্গবন্ধুর এই যুগান্তকারী পদচারণার পরেই বিশ্বমঞ্চে অনেক ছোট ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী নিজ মাতৃভাষায় কথা বলার সাহস ও প্রেরণা পায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি এবং বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, তার শেকড় প্রোথিত রয়েছে সেদিন বঙ্গবন্ধুর সেই সুদূরপ্রসারী সাহসী পদক্ষেপে। যদিও জাতিসংঘ বা বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের সংকীর্ণ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে ছোট রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সেই আহ্বানে পুরোপুরি সাড়া দেয়নি, তবুও শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর সেই জোরালো উচ্চারণ বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

​জাতিসংঘের ডাইাসে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে বিশ্বসভায় গৌরবান্বিত করার সেই দিনটি কেবল একটি দেশের কূটনীতির বিজয় ছিল না; সেটি ছিল বিশ্বের আপামর মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের চিরন্তন দলিল। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করার সেই মুহূর্ত আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত অধ্যায়।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ