ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:০৭ পূর্বাহ্ন

বাঙালির অবিচল আস্থার বাতিঘর: জননেত্রী শেখ হাসিনা

ক্যালেন্ডারের পাতায় কিছু তারিখ কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির রক্তস্নাত ইতিহাস, টিকে থাকার লড়াই এবং হৃদস্পন্দনের অন্য নাম। তেমনি একটি বিশেষ দিন হলো আজকের এই শুভ জন্মদিন—যে দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার মাটি ও মানুষের মুক্তির অতন্দ্র প্রহরী, বঙ্গবন্ধু কন্যা থেকে জননেত্রী ও দেশরত্ন হয়ে ওঠার এক অদম্য পথচলার ইতিহাস।

​১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিলেন ইতিহাসের আলোকবর্তিকা ছড়ানো এক রাজনৈতিক পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা—শেখ হাসিনা। যাঁর বাবা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব। জন্মসূত্রে আলোর মাঝে এলেও তাঁর জীবন কখনো সহজ ছিল না; বরং নিয়তি তাঁকে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে সপরিবারে পিতাকে হারানোর সেই নিষ্ঠুর বেদনা বাঙালি জাতির মতো তাঁর জীবনেও এনেছিল অন্তহীন অন্ধকার। স্বজন হারানোর শূন্যতা আর সামরিক শাসন ও একনায়কতন্ত্রের বুটের তলায় পিষ্ট জাতিকে আলোর পথ দেখাতে দীর্ঘ প্রবাসজীবন পেরিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন নিজের মাতৃভূমিতে।

​শেখ হাসিনার কাছে রাজনীতি কখনোই ক্ষমতার কোনো সিঁড়ি ছিল না; এটি ছিল তাঁর কাছে একটি পবিত্র ব্রত—অন্ধকার থেকে বাংলাদেশকে আলোয় ফিরিয়ে আনা এবং পিতার অসমাপ্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়ার এক আজীবন দায়বদ্ধতা। ২১ আগস্টের ভয়াল গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে কোটালীপাড়ার হত্যাচেষ্টা কিংবা জরুরি অবস্থার সময়কার মিথ্যা মামলা ও দীর্ঘ কারাবাস—কোনো কিছুই তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। ব্যক্তিগত জীবনের সব কষ্ট ও শোককে ইস্পাতকঠিন শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি বারবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছেন আপসহীন সংগ্রাম। সময়ের পরিক্রমায় তিনি হয়ে উঠেছেন আপামর জনসাধারণের ভালোবাসার জননেত্রী।

​১৯৯৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে টানা দায়িত্ব পালনকালে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি দেশকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময়, বিশাল সমুদ্রসীমা জয়, দেশজুড়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবলের বিস্তার এবং মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বমঞ্চে অর্জন করেছে এক নতুন আত্মমর্যাদা। পাশাপাশি, জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার রূপকল্প দেশকে এগিয়ে নিয়েছে দারুণ গতিতে।

​শুধু জাতীয় পরিসরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি আজ এক মানবিক নেতার রোল মডেল। মিয়ানমারে নির্যাতিত প্রায় ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা মানবতার মা খেতাব। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, নারীর ক্ষমতায়ন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও যুগান্তকারী ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের’ মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ও চিরন্তন ঘোষণা—”যতদিন এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো না যাবে, ততদিন আমার সংগ্রাম চলবে”—আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

​২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আজ দেশের মানুষ এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ বড়ো বেশি বিপন্ন। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে তাঁর দৃঢ় ঘোষণা—আসছে আগামী ডিসেম্বরেই তিনি বীরের বেশে প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরবেন, বাংলার মানুষের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবেন এবং তাদের এই চরম দুর্দিন থেকে চিরতরে মুক্তি দেবেন। আজ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই প্রত্যাবর্তনের ক্ষণটির জন্য।

​ঝড় যতই প্রবল হোক, দিগন্তে কোনো না কোনো আলো ঠিকই জ্বেলে রাখে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। আজকের এই জন্মদিন কেবল একটি উৎসব নয়; এটি ফেলে আসা সংগ্রামের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের সোনালী সূর্য দেখার অদম্য আকুলতা। এই ভালোবাসা কোনো মুহূর্তের আবেগ নয়; এটি রক্তে ও আদর্শে গাঁথা এক চিরন্তন বন্ধন। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই বাংলাদেশ একদিন আবারও অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ এক সুবর্ণ শিখরে পৌঁছাবেই।

​রাতের অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক না কেন, ভোরের আলো ফুটবেই। আজকের এই বিশেষ দিনে বাংলার প্রাণপ্রিয় নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে উচ্চারিত হোক কোটি হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আপনার ত্যাগের মহিমা ও সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে চিরকাল প্রদীপ্ত হোক।

​শুভ জন্মদিন, দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ