
মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির গৌরব, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে মিশে আছে অসংখ্য শহীদের রক্ত এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার কাহিনি। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান সেই গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল চত্বরে তাঁর ভাস্কর্যে সম্প্রতি জুতার মালা ঝোলানোর ন্যক্কারজনক ঘটনা তাই শুধু একটি ভাস্কর্যের অবমাননা নয়; এটি মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় বীরদের আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতি চরম ধৃষ্টতা। এর আগে কয়েক মাস আগে এই ভাস্কর্যটি ভাংচুর করা হয়, অপচেষ্টা করা হয়েছিল অপসারন করারও।
১৯৭১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন হামিদুর রহমান। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ধলই সীমান্তচৌকিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। যে তরুণ নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অবদান রেখেছেন, তাঁর স্মৃতির প্রতি এমন অসম্মান জাতির বিবেককে গভীরভাবে আহত করে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এই প্রতীকের অবমাননা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি যথাযথভাবে আমাদের জাতীয় বীরদের সম্মান দিতে পারছি? যে বীরেরা জীবন দিয়ে স্বাধীনতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁদের স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব।
ঝিনাইদহের এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারা এই নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত, কী উদ্দেশ্যে তারা এমন কাজ করেছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে হবে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যসহ দেশের সব মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। শুধু নিন্দা জানিয়ে দায় শেষ করা যাবে না; ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং বীর শহীদদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল বিশেষ দিবসে ফুল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা আমাদের চিন্তা, আচরণ ও মূল্যবোধে প্রতিফলিত হতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত। যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো কিংবা প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ না করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবিতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্মৃতিচিহ্নের মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির অর্জন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানও কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের নন—তিনি বাংলাদেশের সব মানুষের গর্ব, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক। তাঁর স্মৃতির অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাই জাতীয় মর্যাদা রক্ষারই প্রতিবাদ।
জুতার মালা নয়, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রাপ্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য। অবমাননা নয়, তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা হোক আমাদের পরিচয়। যে বীর নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছেন, তাঁর স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অম্লান থাকুক, বীর শহীদদের আত্মত্যাগ চিরকাল বাঙালি জাতির হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত থাকুক।
( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ









