ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ৩:০২ অপরাহ্ন

​আ‌’ লীগের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর অবরুদ্ধ জীবন: উৎসবের ঈদে বিষাদের হাহাকার

বাঙালি সংস্কৃতিতে ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনদের মিলনমেলা। চারিদিকে যখন উৎসবের আলো ঝলমল করার কথা, তখন দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ঘরে জ্বলছে কেবলই কান্নার প্রদীপ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু হওয়া এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় আজ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের জীবনকে চরম বিষাদময় করে তুলেছে। যে সময়টাতে দেশব্যাপী উৎসবের আমেজ থাকার কথা, সেই সময়ে এক বুক হাহাকার আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে এই মানুষগুলোর।

​আজকের বাস্তবতার চেয়ে নির্মম আর কিছুই হতে পারে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ নিজ দেশে পরবাসী। কেউ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশছাড়া, কেউ বা হুলিয়া মাথায় নিয়ে নিজের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবার ছেড়ে যাযাবরের মতো দিন কাটাচ্ছেন। ঘরের কোণে বিষণ্ণ মুখে বসে থাকা মা, কিংবা পথ চেয়ে থাকা সন্তানের কপালে আজ ঈদের আনন্দ নেই, আছে কেবলই এক অজানা আতঙ্ক।

​সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি দেখা যাচ্ছে দেশের কারাগারগুলোতে। প্রায় দেড় লক্ষাধিক নেতা-কর্মী আজ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় বিনা বিচারে কারান্তরীণ। ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি বন্দীর চাপে জেলখানাগুলো যেন একেকটি নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই নির্মম খেলায় আইনের শাসন আজ যেন এক দূরবর্তী কল্পনা। কেবল রাজনৈতিক আদর্শের কারণে হাজার হাজার মানুষকে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অনেককে। এই বন্দিত্ব ও নির্যাতনের নির্মমতা কতটা চরম আকার ধারণ করেছে, তা বোঝা যায় কারাগারের ভেতরের মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখলে। ইতিমধ্যেই জেলে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক নেতা-কর্মী। এই মৃত্যুগুলো কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এগুলো একেকটি পরিবারের চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার গল্প।

​সভ্য সমাজে যে ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা চলে না, তা-ই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাবা-মা রাজনীতি করায় আজ তাদের অবোধ শিশু সন্তানকেও যেতে হচ্ছে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা বই আর খেলনা, সেই বয়সে তার মনে গেঁথে দেওয়া হলো বন্দিত্বের ট্রমা। এই ঘটনা আমাদের বিচারব্যবস্থা ও মানবিক মূল্যবোধের চরম দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে।

​যাদের ঘরের অভিভাবক নিখোঁজ, বাবা কিংবা ভাই জেলে, কিংবা যিনি নিজে আজ ফেরারি—তাদের কাছে ঈদের সকালটা অন্য আটপৌরে দিনের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। সেমাইয়ের সুবাস কিংবা নতুন কাপড়ের গন্ধ তাদের দুয়ারে পৌঁছায় না। ঈদের প্রতিটি মুহূর্ত তাদের মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা চেনা দিনগুলোর কথা, মনে করিয়ে দেয় বর্তমানের এই নিঃসঙ্গতা আর অপমানের গ্লানি। উৎসবের আলো তাই তাদের চোখে কেবলই যন্ত্রণার আগুন হয়ে ধরা দেয়।

​আওয়ামী লীগের এই ক্রান্তিকালে লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী প্রত্যাবর্তনের পরেই আসবে তাদের সত্যিকারের ঈদের আনন্দ।

​ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জুলুম বা নিপীড়ন চিরস্থায়ী হয় না। অসত্য আর ষড়যন্ত্রের মেঘ সাময়িকভাবে সত্যের সূর্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু তাকে চিরতরে মুছে দিতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই কালো অধ্যায় একদিন শেষ হবে। সব মেঘ কেটে গিয়ে একদিন ঠিকই ন্যায়ের আলো ফুটবে। নির্যাতিত মানুষের চোখের জল এবং এই সীমাহীন ত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। সাময়িক এই অন্ধকারের বুক চিরে সত্য, ন্যায় এবং জনমানুষের অধিকার বিজয়ী হবেই—এটাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ