রাজধানী ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদী দূষণে খোদ সরকারি সংস্থায় শীর্ষে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলছে ঢাকা ওয়াসা। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে একক সংস্থা হিসেবে ওয়াসার ৬৬টি বর্জ্য উৎসমুখ (আউটলেট) শনাক্ত হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, নদীগুলোর মোট ৪২৪ প্রত্যক্ষ বর্জ্য উৎসমুখ রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বেসরকারি শিল্প-কারখানার হলেও সরকারি কাঠামোর মধ্যে দূষণের প্রধান উৎস ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনগুলো। ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মোট ৭৮ টি আউটলেট দিয়ে নিয়মিত বর্জ্য মিশছে নদীতে। এছাড়া বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ড্রেনেজ লাইন থেকেও দূষিত পানি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।
বিআইডব্লিউটিএর তালিকা অনুযায়ী, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস ঢাকা ওয়াসা। এর পরই রয়েছে সিটি করপোরেশনগুলো। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মোট ৭৮টি আউটলেট দিয়ে নিয়মিত দূষিত পানি নদীতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩৭টি, ঢাকা দক্ষিণের ২১টি, ঢাকা উত্তরের ১৬টি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চারটি আউটলেট রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক না থাকা এবং স্যানিটেশন ও বৃষ্টির পানির লাইন পৃথক না করাই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। পরিবেশবিদদের মতে,দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় সংযোগ পাইপলাইনের অভাবে প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে।
তবে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দেশপক্ষকে বলেন, ওয়াসার ৬৬টি বর্জ্য উৎসমুখের তথ্য সঠিক নয় এবং দূষণের প্রায় ৫৫ শতাংশই আসে শিল্প খাত থেকে। ভবিষ্যতে নদী দূষণ মুক্ত করতে দুটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও ‘পলিউটার মাস্ট পে’ নীতিতে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রাজধানীর নদী রক্ষায় সমন্বিত ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’ বিষয়ক এক সভায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইটিপি কার্যকরের পাশাপাশি দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত দেশপক্ষকে বলেন, ঢাকা ওয়াসা যে এ শহরের সবচেয়ে বড় নদী দূষণকারী এ তথ্য জেনে আমি মোটেও অবাক হয়নি বরং হঠাৎ করে এ কথাটা সামনে আসার অবাক হচ্ছি! এটা তো ওয়াসা বহু আগে থেকেই জানে। এটা পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট জানে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও ভালো করেই জানে। তারপর সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কেউ মুখ খুলেনি।
ঢাকাসহ সারা দেশে যেসব সংস্থা নদী দূষণ করছে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে এমনটি মনে করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। তিনি দেশপক্ষকে বলেন, ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ পয়োবর্জ্য বহন রে সরকারি প্রতিষ্ঠান। নদী দূষণের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ‘পলিউটার মাস্ট পে’ নীতিতে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, নদী দূষণকারী সরকারি হোক বা বেসরকারি—আইনের চোখে সবাই অপরাধী। বিআইডব্লিউটিএর জরিপে যেসব সরকারি সংস্থার আউটলেট চিহ্নিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি নোটিশ পাঠানো হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না নিলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো: শহীদুল হাসান দেশপক্ষকে জানান, ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। নতুন মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা পৃথক করার কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।






