ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:১১ অপরাহ্ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন সমীকরণ

তৃণমূলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর সেই জনগণের কাছেই জবাবদিহি- স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এমন এক নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে।

জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সুসংগঠিত, গতিশীল ও শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নেতাকর্মীদেরও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। উন্নয়নের সুফল তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের লক্ষ্যেই এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকার মনে করছে, দলীয় পর্যায়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতৃত্ব বাছাইয়ের পাশাপাশি এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমবে, বাড়বে জনসম্পৃক্ততা এবং এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার প্রতি দায়বোধ।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর থেকেই তৃণমূল নেতাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি তাদের মধ্যে এক ধরনের দায়বোধ তৈরি হয়েছে। নিজ উদ্যোগে তারা ভোটারদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। রাস্তাঘাট মেরামত, স্কুল-কলেজের প্রয়োজনীয়তা এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে করণীয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। ফলে ভোটারদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, এর মাধ্যমে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ছে। জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে নেতারা এলাকায় সময় দিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বিরোধ ও সমস্যা সমাধানেও তারা এগিয়ে আসছেন। ফলে নির্বাচনের আগেই জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি সরাসরি যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার কোনো দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং এলাকার মানুষের জন্য তার ভূমিকা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। আর নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ও ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে স্থানীয় নেতাদের জনগণের কাছে যেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকতে পারেন। তবে এককভাবে কোনো প্রার্থীকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ থাকছে না। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীকে সামনে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকার নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে। দলীয় প্রতীক না থাকলেও কোনো প্রার্থী কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তা স্থানীয়ভাবে মানুষের কাছে পরিচিত হতে পারে। তবে এ কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতায় কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না।

স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের সর্বস্তরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়েছে। নির্বাচনে ভালো ফল করার জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। আশা করি সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে। স্থানীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রশাসকদের দায়িত্ব শেষ না হলে পরে সমালোচনা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি দায়িত্ব গ্রহণ করলে জনগণের প্রতি তাদের দায়বোধ বাড়বে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে এলাকার মানুষের সমস্যা, উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ভোটারদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হবে।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি শুরু করেছে। কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

দেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলররা সরাসরি জনগণের গোপন ভোটে নির্বাচিত হন। নির্ধারিত এলাকার ভোটাররা সরাসরি তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন।

অন্যদিকে জেলা পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যানরা সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে এসব নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত বিধি অনুসারে ইসি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদন করবে। ভোট গ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান এবং নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে বিধান করার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও একই ধরনের বিধান রয়েছে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ