
কোনো মহান স্রষ্টার মুখচ্ছবি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলো নিভিয়ে দেওয়া যায় না। সংস্কৃতির বুকে কালি লেপে সাময়িকভাবে একটি প্রতিকৃতি আড়াল করা সম্ভব, কিন্তু একটি জাতির মনন, চেতনা ও আত্মপরিচয়কে মুছে ফেলা অসম্ভব। সম্প্রতি ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীত পাশের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপনের ঘটনা তাই নিছক একটি দেয়ালচিত্র বিকৃত করার ঘটনা নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতীয় পরিচয়ের মৌলিক প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতার কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে একদল ব্যক্তি সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি ও কালো রং লাগানোর উদ্যোগ নেন। এ ঘটনায় শাহবাগ থানা-পুলিশ চারজনকে আটক করে। পরদিন তাঁদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশ ও মামলাসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াস (আল নূর মোহাম্মদ আয়াস), মারজিয়া খন্দকার রিমি, মো. সাকিবুল হাসান এবং মো. সুজন মিয়া। মামলার বিবরণে মারজিয়া খন্দকার রিমির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালো রং লাগানোর অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, উসকানিমূলক বক্তব্য, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে।
ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করার নামে বাংলাদেশের নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ কিংবা জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীককে আক্রমণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ভারতবিরোধী স্লোগানকে সামনে রেখে যদি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা হয়, তবে সেই প্রবণতা নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা কিংবা সাংস্কৃতিক বিদ্বেষের ইতিহাস নয়। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল ভাষার অধিকার, বাঙালির আত্মপরিচয়, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ হলো—দেশের স্বার্থ রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং একই সঙ্গে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অবমাননার বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কারণে। “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”— এই অমর গানের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে আছে মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা, বাংলার প্রকৃতির প্রতি মমতা এবং স্বদেশের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন। যে কবির রচনা স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত, তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি লেপন তাই অনেকের কাছেই কেবল একজন কবির প্রতি অসম্মান নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীককে অবজ্ঞা করারও শামিল।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁদের কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। জাতীয় সংগীতের মতো রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন তাদের কোন যোগসুত্র নেইতো?
রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিদ্বেষ, তাঁর সৃষ্টিকে অবমাননা এবং জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবির মধ্যে যখন একই ধরনের সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতার প্রকাশ দেখা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এসব প্রবণতার আদর্শিক ভিত্তি কি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত?
সেগুনবাগিচার ঘটনার সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবিদারদের কোনো প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিদ্বেষ, জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক এবং অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা একই বৃহত্তর আদর্শিক সংকটের লক্ষণ কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার। জাতীয় সংগীতের রচয়িতাকে অবমাননা এবং জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবির মধ্যে সম্ভাব্য আদর্শিক যোগসূত্র অনুসন্ধান করা জরুরি।
রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি নন; তিনি বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও মানবতাবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর সাহিত্য বাঙালিকে শিখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসতে, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে এবং মুক্তবুদ্ধির আলোয় জীবনকে দেখতে। তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে কারও মতাদর্শগত মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মতপার্থক্যের জবাব কালি দিয়ে প্রতিকৃতি নষ্ট করা নয়; জবাব দিতে হয় যুক্তি, আলোচনা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে। শিল্প-সাহিত্যকে আক্রমণ করে কোনো মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক সাধারণ রিকশাচালকের ছবি মানুষের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। জীবিকার প্রয়োজনে রাস্তায় ছুটে চলা মানুষটি বালতি থেকে পানি নিয়ে গামছার সাহায্যে রবীন্দ্রনাথের মুখের ওপর লেপে দেওয়া কালি মুছে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগে ছিল না কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা কিংবা প্রচারের আয়োজন; ছিল সংস্কৃতির প্রতি মমতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সহজাত মানবিক প্রতিবাদ। তাঁর এই কাজ যেন সংকীর্ণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই রিকশাচালক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব শুধু কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের নয়; এই দায়িত্ব প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের মানবিকতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভিন্নমতের মানুষের সহাবস্থানে। এই শক্তিকে দুর্বল করে এমন যেকোনো অসহিষ্ণু প্রবণতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের রাষ্ট্রের জন্ম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত। সেই চেতনার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলাও জরুরি। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতার নামে যদি কেউ বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আঘাত করেন, তবে তাঁর প্রতিবাদের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
দেশপ্রেমের অর্থ কেবল অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়; দেশপ্রেমের অর্থ নিজের দেশকে ভালোবাসা, তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, তার ইতিহাসকে সম্মান করা এবং তার মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের মর্যাদা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো বিরোধ নেই। বরং প্রকৃত দেশপ্রেম এই দায়িত্বগুলোকে একই সুতোয় গেঁথে দেয়।
সেগুনবাগিচার ঘটনার পর প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর আমাদের আশাবাদী করে। কারণ, এই প্রতিবাদ দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের সমাজে এখনো এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ঘৃণা ও সংকীর্ণতার পরিবর্তে মানবতা, যুক্তি ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তাঁদের এই অবস্থানই প্রমাণ করে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর উগ্রতা দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের চেতনাকে বিচার করা যায় না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, অভিযোগের বিচার আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা এবং শিল্প-সাহিত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো, দেশপ্রেমের নামে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা থেকে সমাজকে সতর্ক রাখা। কারণ, ঘৃণার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; একসময় তা নিজের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
কালি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি আড়াল করা যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলোকে নির্বাপিত করা যায় না। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতাকে অবমাননা করে বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে হলে তা করতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষার দৃঢ় অবস্থান থেকে—নিজের দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে আঘাত করে নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমাদের ভালোবাসার গান, আমাদের আত্মপরিচয়ের গান। রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা মানে শুধু একজন কবিকে সম্মান জানানো নয়; তাঁর রচিত জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে যে মাতৃভূমিকে ভালোবাসার অঙ্গীকার আমরা ব্যক্ত করি, সেই অঙ্গীকারের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা।
সেগুনবাগিচার দেয়ালে লেপে দেওয়া কালি তাই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি দেশপ্রেমের নামে সংকীর্ণতার পথ বেছে নেব, নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে যাব?
আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেবে। কারণ, যে জাতি নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় কোনো বিদ্বেষের কাছে পরাজিত হতে পারে না।
জয় হোক মুক্তচিন্তার, জয় হোক মানবতার, অটুট থাকুক বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ।
( মানিক লাল ঘোষ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহসভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ









