
শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আবেদন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারায় দুর্গাপূজা আজ সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সর্বজনীন আনন্দের এক অনন্য প্রতীক। এই উৎসবের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজ ও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার শারদীয় শুভেচ্ছাবার্তা তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; বরং তা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আদর্শ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি করে।
শেখ হাসিনা তাঁর শুভেচ্ছাবার্তায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আন্তরিক শুভকামনা জানানোর পাশাপাশি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুরসহ সহিংসতার যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলো গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আশ্বস্ত করে শেখ হাসিনার বার্তায় উচ্চারিত—“আপনারা একা নন। এই দেশ আপনাদেরও”—এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক অর্জনের ইতিহাস নয়। এ দেশের মাটি, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে সব ধর্মের মানুষের অবদান রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষের একক আবাসভূমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব নাগরিকের; প্রত্যেকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মৌলিক চেতনা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি এবং নাগরিকের সমঅধিকারের অঙ্গীকারও সেই আদর্শেরই প্রতিফলন। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, সরকার পরিবর্তন কিংবা সামাজিক অস্থিরতা—কোনো পরিস্থিতিতেই নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ আক্রান্ত হলে, উপাসনালয়ে হামলা হলে কিংবা উৎসব পালনে ভীতি তৈরি হলে, তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত নয়; তা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপরও আঘাত।
তবে সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রশ্নে কেবল শুভেচ্ছাবার্তা, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে; অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও কমিশন গঠনের মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নিয়েও আন্তরিক, যুক্তিনির্ভর ও সর্বসম্মত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতার হিসাব কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে তার কার্যকর ভূমিকা থাকতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদেরও সম্প্রীতি রক্ষা ও বিভাজনমূলক প্রচারণা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা। এই দর্শন কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তব জীবনে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হতে হবে। শেখ হাসিনার শারদীয় শুভেচ্ছাবার্তাকে সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে কোনো বার্তার প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের সামঞ্জস্যের ওপর। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক বক্তব্যকে কার্যকর উদ্যোগে রূপান্তর করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়, বৈষম্য কিংবা অবমাননার শিকার হতে হবে না; যেখানে প্রত্যেক মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন এবং অন্যের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সব মানুষের ঘরে ঘরে। বিভেদ নয়, সম্প্রীতি; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; বৈষম্য নয়, সমঅধিকার—এই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
শেখ হাসিনার শারদীয় শুভেচ্ছাবার্তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও হোক এমন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, যেখানে ধর্ম যার যার, কিন্তু নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার সবার।
( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)









