ঢাকা, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ৩:১৩ পূর্বাহ্ন

​সংসদীয় ঐতিহ্যের অবক্ষয় ও দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের সম্মান: এক অশনিসংকেত

অগ্নিঝরা মার্চ মানেই বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার স্পন্দন। ১৯৭১ সালের এই মাসে যে বজ্রকণ্ঠ সাত কোটি বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিল, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে এক অদ্ভুত নীরবতা পরিলক্ষিত হয়েছে। কেবল রাষ্ট্রপতির ভাষণেই নয়, সংসদের কার্যপ্রণালীতেও যখন স্বাধীনতার প্রধান রূপকারকে অবজ্ঞা করা হয়, তখন তা জাতীয় ইতিহাসের চরম বিকৃতির ইঙ্গিত দেয়।

​মূলত, এই সংসদের যাত্রাই শুরু হয়েছে এক গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে। দেশের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা এবং অসংখ্য কারচুপির অভিযোগ মাথায় নিয়ে যে সংসদের গঠন হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতা শুরুতেই গণমানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতি এবং জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন না ঘটায় সংসদের কার্যপ্রণালীতেও এখন চরম একপাক্ষিকতা ও স্বেচ্ছাচারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

​অধিবেশনের শুরুতে জাতীয় সংগীত বাজার সময় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে বিলম্ব করা বা অনীহা প্রকাশ করা কেবল শিষ্টাচার বহির্ভূত নয়, বরং তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরনের প্রকাশ্য অবজ্ঞার শামিল। ইতিহাসের পাতায় যারা দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত, আজ তাদের উত্তরসূরিদের দ্বারা জাতীয় সংগীতের অবমাননা দেশপ্রেমিক জনগণের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। যারা একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করেছিল, আজ তাদের এই আচরণ রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আনুগত্যকেই বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সংসদীয় ঐতিহ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এবারের অধিবেশনে যে বৈপরীত্য দেখা গেল, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। স্বাধীনতার স্থপতিকে যেখানে স্মরণ করা হয়নি, সেখানে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এটি কেবল আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন নয়, বরং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে এক চরম পরিহাস।

​সংসদের এই নজিরবিহীন বিচ্যুতি ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি বিশেষ প্রীতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ফুঁসে উঠেছে দেশের সচেতন সমাজ। জাতীয় সংগীতের অবমাননা ও দণ্ডিত অপরাধীদের প্রতি এই অসম্মানজনক মহানুভবতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর কুঠারাঘাত বলে অভিহিত করেছেন।

​ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল চিরন্তন সত্য। কিন্তু রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর যারা স্থাপন করেছেন, তাঁরা কোনো দলীয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ—এই ধ্রুব সত্যকে আড়াল করার যেকোনো চেষ্টা সাময়িকভাবে সফল হলেও মহাকালের কাছে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। একটি জাতি যখন তার আসল বীরদের সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে এবং দণ্ডিত অপরাধীদের উচ্চাসনে বসায়, সেই জাতির অগ্রযাত্রা নৈতিকভাবে থমকে যেতে বাধ্য।

​ত্রয়োদশ সংসদের এই সূচনা যদি ইতিহাসবিস্মৃতি, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন আর চরম পক্ষপাতের মধ্য দিয়ে হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। সংসদ হওয়া উচিত সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক, যেখানে ইতিহাসকে সম্মানের সাথে লালন করা হবে। আমরা আশা করি, সংসদ তার এই বিচ্যুতি সংশোধন করবে এবং দলমতনির্বিশেষে জাতীয় বীরদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে একটি সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ধারা বজায় রাখবে।

​(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন)

-নি/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ