ঢাকা, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ৩:০৭ পূর্বাহ্ন

অবৈধ টাকা উপার্জনের মেশিনে পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

জুলাই–আগস্টের দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ে গঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বর্তমানে দুর্নীতি, অসাংবিধানিক নিয়োগ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের নানা অভিযোগে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রসিকিউশন প্যানেলের ভেতরে ঘুষ লেনদেন, আসামিকে রাজসাক্ষী করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় ট্রাইব্যুনালটির নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার–এর বিরুদ্ধে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী–কে খালাস পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আসে। গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া একটি হোয়াটসঅ্যাপ অডিও রেকর্ডিংয়ে তাকে অগ্রিম ১০ লাখ টাকা নগদ চাইতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ সামনে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন। এই ঘটনার পর ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এদিকে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম–কে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সাবেক আইজিপিসহ একাধিক মামলার আসামিকে রাজসাক্ষী করার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাকে অপসারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সুলতান মাহমুদের দাবি অনুযায়ী, জুলাই–আগস্টের দাঙ্গায় প্রাণহানির ঘটনায় গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন–কে রাজসাক্ষী করার জন্য হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ধানমন্ডিতে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে বসে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির–এর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।

তার আরও অভিযোগ, সাবেক আইজিপিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধানমন্ডির তদন্ত কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন আইনজীবী শিশির মনির। সুলতান মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে নিরাপদে পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে এবং চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।’

তিনি আরও দাবি করেন, গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ায় ভ্যানে লাশ পোড়ানোর মামলার এক আসামির স্ত্রী একটি ‘ভারী ব্যাগ’ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজি মোনাওয়ার হুসাইন তামিম–এর কক্ষে প্রবেশ করেন। বিষয়টি চিফ প্রসিকিউটরকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে ওই মামলার আসামি আফজালকে রাজসাক্ষী করা হয় এবং চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

এ ছাড়া চানখাঁরপুলে ছাত্র–জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় এসআই আশরাফুলের বিরুদ্ধে ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। একইভাবে রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কয়েকজন সাক্ষী আদালতে এসে এসি ইমরানের নাম উল্লেখ করলেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি উঠেছে।

এদিকে ট্রাইব্যুনালের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইসিটি আইনে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে, সেগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেওয়া অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন—তবে এখানে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিচারক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের দাবি, সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও দ্রুত কয়েকজন বিচারপতিকে স্থায়ী করা হয়েছে।

প্রসিকিউশন প্যানেল গঠনেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অতীতে যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–সহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যার তদন্ত মাত্র এক মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় ঘটনার তদন্ত এত অল্প সময়ে শেষ করার নির্দেশ বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর রোম স্ট্যাটিউটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আদালতে না গিয়ে দেশীয় ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ট্রাইব্যুনাল দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রসিকিউশন প্যানেলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনিয়মের নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন