
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর ইতিহাস বিকৃতির এক ঘৃণ্য খেলায় নামে খুনিচক্র ও তাদের দোসররা। বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় সেই ঘাতকগোষ্ঠী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অবদান ও ত্যাগ সম্পর্কেও যেন পরবর্তী প্রজন্ম জানতে না পারে, সে লক্ষ্যে চালানো হয় নানা অপপ্রচার ও কুৎসা। খুনিদের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ চিরতরে রুদ্ধ করা। যার ফলে, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের বীরত্বগাথা আজও এই প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা রয়ে গেছে।
বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল ছিলেন একজন অকুতোভয় কিশোর বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক গর্বিত সন্তান। তাঁর সাহসিকতা, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং মানুষকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জয় করার শিক্ষা তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হতে পারে। ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন এই বীর সন্তান।
অন্য দশজন কিশোরের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা হয়নি শেখ জামালের। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও মাত্র কয়েকদিনের মাথায় তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। বাংলার সাধারণ মানুষকে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু যেমন তিল তিল করে নিজের পারিবারিক সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, তেমনি তাঁর সন্তানরাও বঞ্চিত হয়েছেন পিতার স্নেহ ও সান্নিধ্য থেকে।
রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে কাটানো দিনগুলো কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী শেখ মুজিব যেমন উপলব্ধি করেছেন, তেমনি তাঁর পরিবারও তা অনুভব করেছে। সেই দুঃসহ দিনগুলোতে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শিশু শেখ জামালকে নিয়ে চরম প্রতিকূলতার মাঝে দিন অতিবাহিত করেছেন। পরবর্তীতে শেখ জামাল ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা শেখ জামালের গিটার শেখার প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে তিনি সেই শখ পূরণ করেছিলেন। সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ ক্রিকেটারও ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু অধিকাংশ সময় কারান্তরালে থাকায় বঙ্গমাতা এবং বড় বোন শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ছোটবেলা থেকেই মানবিক চেতনায় গড়ে উঠেছিলেন শেখ জামাল। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতেই তাঁর রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের চেতনার উন্মেষ ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে শেখ জামালও গৃহবন্দি ছিলেন। কিন্তু দেশমাতৃকার টানে ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট ধানমন্ডির সেই পাকিস্তানি বন্দিশিবির থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে তিনি ভারতে যান। ধরা পড়লে মৃত্যু ছিল অনিবার্য, তবুও অসীম সাহসে পাকিস্তানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি আগরতলা পৌঁছান। সেখান থেকে কলকাতা হয়ে উত্তরপ্রদেশের কালশীতে পৌঁছান এবং ‘মুজিব বাহিনী’র (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) ৮০ জন নির্বাচিত তরুণের সাথে ২১ দিনের বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ৯ নম্বর সেক্টরে যোগদান করে সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর যুদ্ধের পোশাক পরিহিত অবস্থায় বিজয়ীর বেশে দেশে ফেরেন শেখ জামাল। ভাইকে কাছে পেয়ে বড় বোন শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ছোট ভাই শেখ রাসেলের মনে বয়েছিল আনন্দের জোয়ার। ওই দিন বিকেলেই পল্টনে মুক্তিযোদ্ধাদের জনসভায় উপস্থিত ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে সামরিক পোশাকে পিতার সামনে দাঁড়িয়ে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পূর্ণাঙ্গরূপে গঠিত হলে শেখ জামাল সেনাবাহিনীর লং কোর্সের প্রথম ব্যাচের কমিশনড অফিসার হন। ১৯৭৪ সালে তিনি যুগোস্লাভিয়ার মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত স্যান্ডহার্স্ট একাডেমি থেকে তিনি উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। তাঁর সামরিক প্রতিভা দেখে যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটো তাঁকে পেশাদার সেনাকর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলেন।
প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে ঢাকা সেনানিবাসের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন শেখ জামাল। সততা, পেশাদারিত্ব ও অমায়িক আচরণে তিনি অল্প সময়েই সহকর্মীদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে সিনিয়র অফিসার—সবার হৃদয়েই তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন। তাঁর নিরহংকার জীবনযাপন আজও সেনাবাহিনীতে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
কর্মক্ষেত্রে শেখ জামাল ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। তাঁর আচার-আচরণে কখনো প্রকাশ পায়নি যে তিনি এ দেশের মহান রাষ্ট্রনায়কের সন্তান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত রাতে ব্যাটালিয়নের ডিউটি অফিসার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। সেনানিবাসে রাত কাটানোর অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যে সেনাবাহিনীকে নিয়ে ছিল তাঁর সব স্বপ্ন, সেই বাহিনীরই কিছু পথভ্রষ্ট ও কুচক্রী সদস্যের হাতে পরিবারের সবার সাথে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
মাত্র ২২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে শেখ জামাল দেশপ্রেম ও কর্মদক্ষতার যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা অতুলনীয়। যদিও দীর্ঘকাল তাঁর বীরত্বগাথাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সত্য আজ উদ্ভাসিত। শহীদ শেখ জামাল আজ বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত। পাশে আছেন তাঁর স্ত্রী রোজী জামাল, যিনি বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় ওই কালরাতেই শহীদ হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারো ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের গৌরবগাথা মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এমন ষড়যন্ত্র অতীতেও সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। একজন গর্বিত সেনাসদস্য এবং দুঃসাহসী দেশপ্রেমিকের প্রতীক হিসেবে শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তর। তাঁর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
-নি/ এমএইচ







