ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ৩:১২ পূর্বাহ্ন

​স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধু: একটি মানচিত্রের জন্ম ও অস্তিত্বের শেকড়

২৬ মার্চ—বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে অহংকৃত অধ্যায়। রক্তে ভেজা এক অবিনাশী ভোরে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ নামক এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের শোষণ-বঞ্চনার দীর্ঘ পথচলা এবং একজন মহামানবের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বাধিকার আন্দোলন। তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ—এ যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। একজনকে ছাড়া অন্যজনকে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি স্বাধীনতার ডাক দেননি। ১৯৪৮ সালে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার মধ্য দিয়ে যে অগ্নিগর্ভ সংগ্রামের শুরু হয়েছিল, তাকে তিনি ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতার অভিমুখে নিয়ে গিয়েছিলেন। ৫২-এর রক্তঝরা রাজপথ, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন পেরিয়ে ৬৬-এর ‘ঐতিহাসিক ৬-দফা’ ছিল বাঙালির মুক্তির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা সনদ। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, স্বশাসন ছাড়া শোষণমুক্তি সম্ভব নয়। এই দূরদর্শী চিন্তাই ৭০-এর নির্বাচনে বাঙালিকে এক সুতায় বেঁধেছিল, যার ফলে বিশ্ববাসী দেখেছিল ব্যালট বিপ্লবের এক বিরল দৃশ্য।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ১৮ মিনিটের ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত বাঙালির স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপরেখা। তাঁর সেই অবিনাশী ঘোষণা— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মহামন্ত্র। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির স্বাধিকারের মহাকাব্য। ইউনেস্কো কর্তৃক একে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দান আজ প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী মানুষের এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে এ দেশের মাটিতে জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে, বঙ্গবন্ধু তখন অটল পাহাড়ের মতো অবিচল। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর সেই ঘোষণা ইপিআরের ওয়ারলেস বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকলেও তাঁর আদর্শ ও নামই ছিল বাঙালির রণকৌশল। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই মহান স্বাধীনতা।

কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম ও নিষ্ঠুর পরিহাস আজ আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। যে মানুষটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়েছেন বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে, যাঁর তর্জুনির ইশারায় একটি নিরস্ত্র জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আজ সেই জাতিরই একাংশের হাতে তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও আমরা দেখছি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
​ধানমন্ডি ৩২ নম্বর—যা কেবল একটি সাধারণ বাড়ি নয়, বরং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার—তা আজ কয়েক দফায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যে বাড়িটি ছিল আমাদের আবেগের আশ্রয়স্থল, তাকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে মূলত একটি জাতির শেকড়কেই উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রতিকৃতি ভাঙচুর করা হচ্ছে, এমনকি তাঁর জন্মদিনের মতো জাতীয় শোক ও শ্রদ্ধার দিনগুলোতে ৩২ নম্বর পাহারা দিয়ে রাখা হচ্ছে যেন কেউ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে না পারে। ইতিহাস থেকে তাঁর নাম ও অবদান মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা আজ দৃশ্যমান।

​বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নন; তিনি একটি রাষ্ট্র ও মানচিত্রের স্থপতি। তাঁকে অস্বীকার করা মানেই বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি ও কোটি মানুষের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু জাতির পিতার আসনটি হওয়া উচিত বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু কেবল একটি ভূখণ্ডই চাননি, তিনি চেয়েছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং শোষণমুক্ত ‘সোনার বাংলা’। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে তিনি রাষ্ট্র নির্মাণের যে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন, তা আজ আমাদের পথ চলার চিরন্তন প্রেরণা।
​আজ স্বাধীনতার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা যখন একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছি, তখন বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও দর্শনই আমাদের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালি সত্তার জয়গান। মহান স্বাধীনতা দিবসের এই পবিত্র ক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া। জাতির পিতার ত্যাগ ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে আমরা যদি একটি মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি, তবেই সার্থক হবে শহীদদের সেই রক্তঋণ। বিনম্র শ্রদ্ধা সেই মহানায়ককে, যাঁর জন্ম না হলে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ কেবল একটি স্বপ্ন হয়েই থাকত।

​( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ