
পহেলা মে মহান মে দিবস। মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক এক দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলে ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আর এই আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধু কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের অতি আপনজন। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ মমত্ববোধ প্রতিফলিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রদত্ত ভাষণে। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন।
”আপনি চাকরি করেন আপনার মায়না দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মায়না দেয় ওই গরিব শ্রমিক। তাদের সম্মানের সাথে কথা বলুন। তাদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করুন। আপনার সংসার চলে তাদের টাকায়।”
বঙ্গবন্ধুর কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত সংজ্ঞাই ছিল শ্রমিকের মুক্তি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “এই স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলাদেশের কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।” স্বাধীনতার পর তাঁর উদ্যোগেই প্রথমবার মে দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন শুরু হয় এবং তিনি এই দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আইএলও (ILO)-এর সদস্যপদ লাভ করে।
বঙ্গবন্ধুর সেই মানবিক ও শ্রমিকবান্ধব দর্শনকে ধারণ করেই তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা টানা দেড় দশক বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির ভাগ্যোন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেছেন। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত তাঁর সরকার ছিল প্রকৃতপক্ষেই শ্রমিকবান্ধব। শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন-২০১৮’ প্রণয়ন, নূন্যতম মজুরি দফায় দফায় বৃদ্ধি এবং ‘বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। বিশেষ করে পোশাক খাতের নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিতে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে মেহনতি মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন করেনি। বরং তার সরকার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা বা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার চেয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক মন্দার অজুহাতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমজীবী মানুষ আজ দিশেহারা, অসংগঠিত খাতের বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠী আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই সময়ে বর্তমান সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় দেশের মানুষ।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “মালিক-শ্রমিকের একটা সুন্দর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে হবে। এ সম্পর্কের অবনতি হলে দেশের উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।” আজ ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সেই উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মালিক-শ্রমিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পেলে দেশের অর্থনীতি আরো পঙ্গু হয়ে যাবে।
পরিশেষে বলতে চাই, শ্রমিকদের কেবল উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের প্রকৃত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সংকটময় সময়ে মালিক-শ্রমিকের দূরত্ব কমিয়ে বঙ্গবন্ধুর দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রমিকের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার। কারণ, শ্রমিকের হাত ধরেই গড়ে উঠবে প্রকৃত সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ।
(লেখক: মানিক লাল ঘোষ—সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।)
দেশপক্ষ/ এমএইচ






