
বাংলাদেশ মানেই হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, যেখানে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সূচনা হয়েছিল, তা যেন দুই বছর পেরিয়েও আজও আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ইউনুসের দুঃশাসনকালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের যে খড়গ নেমে এসেছিল, তা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সরকার পরিবর্তন হলেও এটি চলমান এক ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত সংকটে রূপ নিয়েছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মীয় স্থাপনায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমুর্তি নির্মাণের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়ভাবে উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের বিরোধিতায় মাঠে নামে। মহাসড়কের পাশে আয়োজিত সমাবেশ থেকে যেভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আরাধ্য দেবতা শ্রীরামচন্দ্রের ছবিকে অবমাননা ও জুতা নিক্ষেপ করা হয়েছে, তা কেবল একটি ঘটনার নয়, বরং আমাদের দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর একটি বড় আঘাত।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও অস্তিত্বের লড়াই
এই সংকটের সময় বগুড়ার শিবগঞ্জে ৩টি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা সনাতনী সম্প্রদায়ের মনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। শুধু শিবগঞ্জ নয়, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ও সাম্প্রদায়িক উসকানি সনাতনীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে এবং চরম অবমাননাকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আজ দেশের সনাতনী সমাজ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ফুঁসে উঠছে। আরাধ্য দেবতা ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের অবমাননা এবং প্রতিনিয়ত ধর্মীয় স্থাপনার ওপর হামলার ঘটনায় তারা তাদের ধর্মীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাজপথে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকতা আজও ২০২৬ সালে এসেও অব্যাহত। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ঘরবাড়ি লুট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার যে ধারা চলছে, প্রশাসন তার বিরুদ্ধে বরাবরই যেন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই শৈথিল্য অপরাধীদের ক্রমাগত বেপরোয়া করে তুলছে।
এই দীর্ঘ সংকটের অন্যতম উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। একজন ধর্মীয় নেতাকে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখা সনাতনী সম্প্রদায়ের মনে যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, তা জাতীয় সম্প্রীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দীর্ঘদিনের কারাবাস ও সরকারি নিষ্ক্রিয়তা দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অশান্তির এই আগুনের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নেওয়া মৌলবাদী গোষ্ঠী। যারা রামচন্দ্রের ছবিকে অবমাননা করে বা মূর্তি স্থাপনে বাধা দিয়ে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করতে চায়, তারা মূলত বাংলাদেশের সংবিধান ও মূলমন্ত্রের বিরোধী। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিতিশীলতার দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যখন প্রতিটি ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন অপরাধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তখন অপরাধীরা স্বভাবতই প্রশ্রয় পায়।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও সংখ্যালঘু সমাজ এখনো নিজেদের অরক্ষিত মনে করছে। আমাদের জোর আহ্বান—তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করুন। পলাশবাড়ীতে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের ছবি অবমাননা এবং মন্দির ও মূর্তি স্থাপনে বাধা প্রদানকারী ও শিবগঞ্জে মন্দিরে প্রতিমা ভাংচুরকারীদের অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনুন। একই সাথে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মতো কারাবন্দী ধর্মীয় নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিন।
সম্প্রীতির এই দেশ কি কেবল একটি স্লোগান হয়েই থাকবে? নাকি আমরা আবার সেই শান্তিময় বাংলাদেশ ফিরে পাব, যেখানে রাম-কৃষ্ণের ভক্ত কিংবা মসজিদের মুসল্লি—সবাই নির্ভয়ে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে? উত্তর দেওয়ার সময় ফুরিয়ে আসছে।
(মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ (কেন্দ্রীয় কমিটি) ও সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ







