ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১:০৯ পূর্বাহ্ন

জননেতা মোহাম্মদ নাসিম ও সংকটে ঘেরা রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত নাম মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা এই লড়াকু নেতা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছিলেন দলের ‘ট্রাবলশুটার’ এবং আপোষহীন এক যোদ্ধা। ২০২০ সালের ১৩ জুন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান; তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের প্রেরণা।

​মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়েছিল। সেই চরম দুঃসময়েও তিনি আদর্শচ্যুত হননি। আওয়ামী লীগের সকল সংকটকালীন সময়ে তিনি সাহসের সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার। তিনি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, ছিলেন দলের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে কাণ্ডারি। যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর) আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন জনগণের সঙ্গে তার কতটা গভীর সংযোগ ছিল।
​জাতীয় সংসদে তিনি যেমন ছিলেন সরব ও বলিষ্ঠ, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও দেখিয়েছেন অনন্য দক্ষতা। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারে তিনি স্বরাষ্ট্র এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। এছাড়া জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন।

​মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে ১/১১-এর জরুরি অবস্থার সময় তাকে কারাবন্দী রেখে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। তবুও তিনি তার নীতি ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি।

​তিনি ছিলেন যথার্থই একজন ‘মাঠের নেতা’। সাধারণ কর্মীদের সুখ-দুঃখে তিনি যেভাবে সাড়া দিতেন, তা ছিল বিরল। করোনা মহামারির মতো চরম সংকটের সময়েও যখন চারদিকে আতঙ্ক, তখনও তিনি তার নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের মানুষের কথা ভোলেননি। নিজের শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে মানুষের ত্রাণ ও সুরক্ষার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেভাবে কাজ করে গেছেন, তা তার অকৃত্রিম কর্মী-বান্ধব মানসিকতার পরিচয় বহন করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে তিনি ছিলেন সবসময় অনমনীয় এবং আপোষহীন।

​আজকের দিনে যখন আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তখন মোহাম্মদ নাসিমের অভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়। তার চিরবিদায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা পূরণ হওয়ার নয়। নাসিম ছিলেন দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মত ও পথের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষ কারিগর। ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন মতাদর্শিক দলকে এক সুতোয় গাঁথতে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। রাজনৈতিক সংকটে বা জাতীয় কোনো ইস্যুতে তিনি যেভাবে স্পষ্ট ও নির্ভীকভাবে দলের অবস্থান তুলে ধরতেন, তা আজ বিরল। বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক রাজনীতির ভিড়ে তার মতো স্পষ্টভাষী ও মাটিঘেঁষা নেতার অভাব প্রতি পদক্ষেপে অনুভূত হয়।

​মোহাম্মদ নাসিম ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ এবং দেশের স্বার্থকে সর্বদা বড় করে দেখতেন। আজ যখন রাজনীতির মাঠ অনেক বেশি কৌশলী, তখন তার মতো একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক নেতার আদর্শ আমাদের নতুন করে ভাবায়। তার রেখে যাওয়া সাহস, সততা এবং জনসেবার ব্রত বর্তমান প্রজন্মের তরুণ রাজনীতিকদের জন্য পাথেয়। তার শূন্যতা হয়তো কোনো একক ব্যক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে তার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে গেলেই তার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই কিংবদন্তি নেতাকে। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কর্মে, তার সাহসে এবং বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক অর্জনের ইতিহাসের পাতায় পাতায়।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন -ডিইউজে’র সাবেক সহ-সভাপতি)

দেশপক্ষ/ এইএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ