ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ৬:১৭ অপরাহ্ন

মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরবে ছড়ানো বিষে বাড়ছে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি

ফাইল ফটো

প্রতিদিনের খাবার টেবিলে এক অদৃশ্য বিষের উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। দেশের নদী ও খালে ফেলা প্লাস্টিক কণা ভেঙে তৈরি হওয়া ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ এখন মাছ, লবণ ও ভোজ্যতেলের মাধ্যমে সরাসরি স্থান করে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের খাদ্যের থালায়। সম্প্রতি সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টারের সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (মৎস্য) ড. মো. শরীফুল ইসলামের এক গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এই নীরব আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

সাধারণত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। পলিথিন, বোতল, সিনথেটিক কাপড় কিংবা মাছ ধরার প্লাস্টিকের জাল—সূর্যের আলো, তাপ ও পানির ঘর্ষণে সময়ের ব্যবধানে ক্ষুদ্র কণিকায় রূপান্তরিত হয়। নদী ও ড্রেনের প্রবাহে মিশে যাওয়া এসব কণা পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকে। ছোট জলজ প্রাণী ও প্ল্যাংকটন এগুলোকে খাবার ভেবে গ্রহণ করে। এরপর ছোট মাছ থেকে বড় মাছ হয়ে পরিশেষে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নানা গবেষণায় ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস এবং প্লাসেন্টাতেও এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। দেশের মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার মতো প্রধান নদীগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া রূপসা ও ভৈরব নদীর পলিতে প্রতি কেজিতে হাজার হাজার প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব মিলেছে। বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া একাধিক প্রজাতির মাছ এবং স্থানীয় উৎপাদিত লবণেও এই বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপ্রতুল পরিশোধনাগারের কারণে শহর ও শিল্পাঞ্চলের প্লাস্টিক বর্জ্য সহজেই নদীগুলোতে গিয়ে জমা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই আগ্রাসন কেবল পরিবেশ দূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি, ব্লু-ইকোনমি এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। বিশ্বজুড়ে গবেষণাগারে দেখা গেছে, এই উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করে প্রদাহ, সেলুলার ক্ষতি এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। তবে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সঠিক মাত্রা নির্ধারণে আরও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের প্রয়োজন হলেও, পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আগেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়াকে জরুরি মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই সংকট কাটাতে পাঁচ দফা সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা। এরমধ্যে রয়েছে-একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিংয়ের উৎপাদন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, শহর ও শিল্প এলাকার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য যেন নদীতে না নামতে পারে, সে জন্য তদারকি ও কার্যকর ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ নীতি চালু, নদী, পলি ও জলজ প্রাণীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি মানসম্মত জাতীয় মনিটরিং প্রটোকল তৈরি করা।

এছাড়াও বিশেষ করে হালদার মতো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্রে দূষণের নির্দিষ্ট উৎসগুলো মানচিত্রায়ন করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুল থেকে শুরু করে শিল্প প্রতিষ্ঠান সব পর্যায়ে সচেতনার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্জ্য ফেলার এই সংস্কৃতি না বদলালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের পুরো মৎস্য খাত ও জনস্বাস্থ্য। ড. শরীফুল ইসলামের ভাষায়, নদী শুধু আমাদের ফেলে দেওয়া বর্জ্য বহন করে না, বরং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা আবার আমাদের থালায় ফিরিয়ে আনে। অদৃশ্য এই দূষণ রোধে কঠোর নীতি, নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণই এখন একমাত্র পথ।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান ও অন্তবর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশপক্ষকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত নদীগুলোকে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করছি। একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধের আইন কাগজে-কলমে থাকলেও প্রয়োগের অভাব স্পষ্ট। প্লাস্টিক উৎপাদকদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে এবং বিকল্প পচনশীল উপাদান বাজারজাত না করলে কেবল সচেতনতার কথা বলে নদী বা খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করা সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ বি এম আবদুল্লাহ দেশপক্ষকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্ত ও টিস্যুতে জমা হওয়া মোটেও কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি শরীরের কোষগুলোর স্বাভাবিক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়, হরমোনজনিত জটিলতা তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আমরা কী খাচ্ছি সে বিষয়ে তদারকি না বাড়ালে সামনে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

ডিপি/ এএস/ এ এ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন